প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
সমুদ্রের নিচে বায়ুশক্তিচালিত ডাটা সেন্টার চালু করে ইতিহাস গড়ল চীন
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসারের সাথে সাথে এক বিশাল জ্বালানি ও সম্পদের সংকট তৈরি হয়েছে। এই বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত বিপ্লবকে সচল রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে কোটি কোটি সার্ভার এবং বিশালাকার ডাটা সেন্টার, যা বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি গ্রাস করছে। এই জটিল ও বহুমুখী সংকটের এক যুগান্তকারী এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে এখন আবির্ভূত হয়েছে সমুদ্রের তলদেশে ডাটা সেন্টার বা তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের অভিনব ধারণা। পানির নিচে তথ্য সংরক্ষণের এই আধুনিক প্রয়াস প্রযুক্তি দুনিয়ায় একেবারে নতুন না হলেও, সম্প্রতি এই ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন। দেশটির সাংহাই উপকূলে বিশ্বের সর্বপথম সমুদ্রের তলদেশে বায়ুশক্তি বা উইন্ড ফার্ম দ্বারা চালিত একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ডাটা সেন্টার সফলভাবে চালু করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ পথরেখাকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি সাংহাই উপকূল থেকে প্রায় দশ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে গভীর সমুদ্রের বুকে গড়ে তোলা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দশ মিটার গভীরে অত্যন্ত সুরক্ষিত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই বিশালাকার তথ্যকেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়। এই পুরো প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক দিক হলো এর শতভাগ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। সমুদ্রের প্রবল বাতাসকে কাজে লাগিয়ে সচল থাকা নিকটবর্তী একটি অফশোর উইন্ড ফার্ম বা সমুদ্রভিত্তিক বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এই ডাটা সেন্টারে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। চীনা সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যানুযায়ী, এই আন্ডারওয়াটার বা জলতল ডাটা সেন্টারটি সাধারণ স্থলভাগের ডাটা সেন্টারের তুলনায় প্রায় বিশ শতাংশেরও বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম, যা বর্তমান শক্তি সংকটের যুগে একটি অভাবনীয় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।সাংহাই লিংগাং আন্ডারসি ডাটা সেন্টার ডেমোনস্ট্রেশন নামের এই দূরदर्शी ও উচ্চাভিราะห์ী প্রকল্পটি গত মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। এই বিশাল কেন্দ্রের প্রাথমিক বিদ্যুৎ ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে চব্বিশ মেগাওয়াট। চীনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হাইক্লাউড টেকনোলজি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রভাবশালী সংস্থা চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানির একটি শক্তিশালী যৌথ উদ্যোগের ফসল হলো এই প্রকল্পটি। এই সমুদ্রগর্ভের তথ্যকেন্দ্রটি কেবল যে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করছে তা নয়, বরং এটি প্রাকৃতিকভাবে সমুদ্রের শীতল পানিকে কাজে লাগিয়ে এর নিজস্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রাকৃতিক এই শীতলীकरण প্রক্রিয়ার ফলে কৃত্রিম উপায়ে অতিরিক্ত কুলিং বা ঠান্ডা করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং তার পেছনে বিপুল শক্তির অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।সাধারণত স্থলভাগে যেসব বিশালাকার ডাটা সেন্টার গড়ে ওঠে, সেগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এবং ব্যয়ের জায়গা হলো সার্ভারগুলোকে অতিরিক্ত উত্তাপ থেকে রক্ষা করা। প্রথাগত স্থলভিত্তিক ডাটা সেন্টারগুলোতে মোট উৎপাদিত বা ব্যবহৃত বিদ্যুৎ শক্তির প্রায় পঁচিশ থেকে চলিশ শতাংশই ব্যয় হয়ে যায় চব্বিশ ঘণ্টা সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য জল সঞ্চালন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সচল রাখতে। সমুদ্রের তলদেশে তাপমাত্রা প্রাকৃতিকভাবেই অনেক কম থাকায় এবং বিপুল জলরাশির সার্বক্ষণিক প্রবাহের কারণে এই বিশাল অপচয়টি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ফলে এই প্রযুক্তি একদিকে যেমন সাশ্রয়ী, অন্যদিকে তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এক বিশাল ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।সমুদ্রের নিচের এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর কেবল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই করছে না, বরং এটি মানবজাতির জন্য আরও একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক সংকট মোকাবেলালায় ঢাল হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভৌত মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই ডাটা সেন্টারগুলো এতকাল যাবৎ কোটি কোটি লিটার বিশুদ্ধ স্বাদুপানি বা মিষ্টি পানি ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছিল। স্থলভাগের ডাটা সেন্টারগুলোকে ঠান্ডা রাখতে যে পরিমাণ পানির অপচয় হয়, তা পৃথিবীর অনেক দেশের সাধারণ মানুষের জীবনধারণের পানির অধিকারকে হরণ করছে। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথ সম্প্রতি এক উদ্বেগজনক ও সতর্কবার্তায় জানিয়েছে যে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ডাটা সেন্টারগুলোর বার্ষিক পানির ব্যবহার প্রায় ৯ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন লিটারে গিয়ে পৌঁছাতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ পানির পরিমাণ কতটা ভয়াবহ, তা বোঝাতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এটি সমগ্র সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলের প্রায় একশো ত্রিশ কোটি মানুষের পুরো এক বছরের গৃহস্থালি ও জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পানির সমান। এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রের লোনা পানিকে কাজে লাগিয়ে ডাটা সেন্টার পরিচালনা করা হলে স্থলভাগের মূল্যবান মিষ্টি পানির ওপর চাপ প্রায় সম্পূর্ণ কমে যাবে।ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পানির নিচে ডাটা সেন্টার তৈরির এই সাহসী চিন্তাভাবনা কিন্তু একদমই সাম্প্রতিক নয়। আজ থেকে প্রায় আট বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে বিশ্বখ্যাত মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের কাছে উত্তর সাগরের তলদেশে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করেছিল। দুই বছর ধরে সফলভাবে পরিচালনার পর ২০২০ সালে মাইক্রোসফট অত্যন্ত ইতিবাচক ফলাফলও ঘোষণা করেছিল এবং দেখিয়েছিল যে পানির নিচের পরিবেশ স্থলভাগের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং সেখানে সার্ভার নষ্ট হওয়ার হারও অনেক কম। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পরবর্তীতে মাইক্রোসফট এই অতি সম্ভাবনাময় প্রকল্পটির বাণিজ্যিক অগ্রগতি থামিয়ে দেয়। পশ্চিমা বিশ্বের এই থমকে যাওয়ার সুযোগটিকে অত্যন্ত চতুরতা ও দক্ষতার সাথে কাজে লাগিয়েছে চীন। এর আগে ২০২৩ সালেও হাইক্লাউড কোম্পানি দক্ষিণচীনের হাইনান দ্বীপে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক আন্ডারওয়াটার ডাটা সেন্টার চালু করেছিল, তবে এবারের সাংহাই প্রকল্পটি পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে কারণ এটিই বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ সমুদ্রের বায়ুশক্তি দ্বারা চালিত আত্মনির্ভরশীল তথ্যকেন্দ্র।হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির প্রখ্যাত গবেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ড. হানজিয়াং ডং এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মার্কিন প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট প্রারম্ভিক段階ে এই ধারণার কার্যকারিতা ও বৈজ্ঞানিক সত্যতা প্রমাণ করতে পারলেও চীন একে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বাণিজ্যিক ও বাস্তব রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। এর মূল কারণ হলো চীন তাদের বিশাল বাজার চাহিদা, নিজস্ব শিল্প সক্ষমতা, উন্নত সামুদ্রিক প্রকৌশল এবং সরকারের সুদূরপ্রসারী नीतिগত সহায়তা ও বিপুল তহবিলকে একসাথে চমৎকারভাবে সমন্বয় করতে পেরেছে। সাংহাইয়ের এই লিংগাং উপকূলে অবস্থিত উইন্ড ফার্মটি মূলত একটি অত্যন্ত আধুনিক হাই-টেক ফ্রি-ট্রেড জোনের কাছাকাছি গড়ে উঠেছে, যার পাশেই রয়েছে মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার বিখ্যাত গিগাফ্যাক্টরি। এই ভৌগোলিক অবস্থান প্রমাণ করে যে চীন এই অঞ্চলটিকে ভবিষ্যতের একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।চীন সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তাদের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করেছে। গত বছর দেশটির সরকার একটি বিশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করে, যেখানে দেশজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও যুগোপযোগী ডাটা সেন্টার নির্মাণ দ্রুততর করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সাথে ২০৩০ সালের মধ্যে সমগ্র শিল্প খাতে সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এই সাংহাই লিংগাং সমুদ্রগর্ভস্থ ডাটা সেন্টারটিতে চীনা সরকার এবং অংশীদাররা প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ১৭৭ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী দূরদর্শিতারই প্রমাণ।অবশ্য প্রতিটি যুগান্তকারী প্রযুক্তির মতোই এই সমুদ্রগর্ভস্থ ডাটা সেন্টারেরও কিছু পরিবেশগত ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা নিয়ে পরিবেশবিজ্ঞানীদের মধ্যে সূক্ষ্ম বিতর্ক চলছে। পানির নিচের এই বিশালাকার স্থাপনাগুলো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর এক ধরনের কৃত্রিম প্রভাব তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে স্থাপনা নির্মাণের সময় সমুদ্রের তলদেশের পলি ও মাটির স্বাভাবিক বিন্যাস বিঘ্নিত হওয়া কিংবা সার্ভার থেকে নির্গত তাপের কারণে সমুদ্রের পানির স্থানীয় তাপমাত্রা পরিবর্তনের মতো আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সমকালীন বিশ্বের অগ্রগণ্য বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই সমস্ত ঝুঁকি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং এর জন্য কেবল প্রয়োজন কঠোর ও নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। বোর্নমাউথ ইউনিভার্সিটির বিখ্যাত সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক রিক স্টাফোর্ড এই বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, সমুদ্রের পানি দিয়ে কুলিং করার ফলে হয়তো কেন্দ্রের আশেপাশের কিছু সীমিত এলাকার তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে, কিন্তু সমুদ্রের বিশাল জলরাশি ও তীব্র স্রোতের কারণে এই তাপ দ্রুত বিলীন হয়ে যাবে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব খুব দূর পর্যন্ত ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলশ্রুতিতে, পরিবেশগত সুনিপুণ নজরদারি বজায় রেখে এই প্রযুক্তিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারলে তা আগামী দিনে মানবসভ্যতার ডিজিটাল চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পৃথিবীর জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষায় এক অনন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল