প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
সিগারেটের অবৈধ বাজারে লাগাম টানতে আসছে কঠোর বিধিমালা
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি অর্জিত হয় দেশের তামাক খাত থেকে। আর এই বিপুল আয়ের সিংহভাগ, প্রায় ৯৫ শতাংশই এককভাবে আসে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রয় থেকে। জাতীয় রাজস্বের অন্যতম প্রধান এই উৎস থেকে প্রতি বছর সরকারের কোষাগারে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ বাড়লেও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ও ঝুঁকি বিবেচনা করে প্রতি অর্থবছরের বাজেটেই এই খাতে শুল্কের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তবে শুল্কবৃদ্ধির এই নিয়মের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজারে এক শ্রেণির অসাধু চক্রের মাধ্যমে সিগারেটের অবৈধ উৎপাদন এবং চোরাচালানের প্রবণতাও নজিরবিহীনভাবে বাড়ছে। তামাক বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের প্রচলিত ও অত্যন্ত জনপ্রিয় নামী ব্র্যান্ডগুলোর প্যাকেটের অবিকল নকল বা হুবহু জালিয়াতি করে অত্যন্ত নিম্নমানের তামাক দিয়ে সিগারেট তৈরি ও তা সারা দেশে বাজারজাতকরণের একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এর ফলে প্রতি বছর সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা।এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে দেশের মোট সিগারেটের বাজারের প্রায় ১৩ থেকে ১৫ শতাংশই এই অবৈধ কারবারিদের কালো হাতের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই বিশাল চুরির ফলে প্রতি বছর সরকারের প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার রাজকীয় রাজস্ব সরাসরি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। দেশের এই অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সিগারেটের এই অবৈধ বাজার ও জালিয়াতি কঠোরভাবে দমনের জন্য এক যুগান্তকারী ও নিশ্ছিদ্র আইনি বিধিমালা আরোপ করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। নতুন এই খসড়া বিধিমালায় বিশ্বজুড়ে অনুসৃত এবং অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হওয়া আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক সাতটি বিশেষ বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা, সিগারেটের প্রতিটি প্যাকেটে বিশেষ বারকোড বা স্ক্যানিং ব্যবস্থা রাখা, ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিরাপত্তা ব্যান্ডরোল সার্বক্ষণিক নজরদারি করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কর ফাঁকির ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা এবং সামগ্রিক কর কাঠামোর আমূল পুনর্বিন্যাস করা।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সূত্র থেকে জানা গেছে, তামাক খাতের এই অবৈধ সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত চতুর ও সুসংগঠিত। তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং জাল বা ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিজেদের অবস্থান এবং কারখানার ঠিকানা বদলে ফেলে। এই আধুনিক জালিয়াতির কারণে শুধুমাত্র রাজস্ব বোর্ডের সনাতন বা সাধারণ মাঠপর্যায়ের অভিযান দিয়ে এই ক্ষতিকর পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। আর এই কারণেই এই গভীর সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর এক অভেদ্য ও আধুনিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নতুন এই কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।এই নতুন ব্যবস্থার অধীনে এখন থেকে প্রতিটি সিগারেটের প্যাকেটে একটি করে অনন্য ডিজিটাল কোড ব্যবহার করা হবে, যা সরাসরি কারখানা থেকে উৎপাদনের মুহূর্তেই সরকারি মূল সার্ভারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হয়ে যাবে। একটি সিগারেট ফ্যাক্টরি থেকে বের হওয়া, পরিবেশকের গুদামে পৌঁছানো, পাইকারি বাজারে বেচাকেনা এবং সর্বশেষ খুচরা দোকানে সরবরাহ করা—প্রতিটি ধাপের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে বাজারে জাল বা ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল পুনরায় ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং কোনো কোম্পানিই তাদের প্রকৃত উৎপাদন গোপন রেখে বাজারে অতিরিক্ত পণ্য ছাড়তে পারবে না। পাশাপাশি প্যাকেটে থাকা বিশেষ স্ক্যানিং কোডটি সাধারণ ক্রেতা বা পরিদর্শকেরা নিজেদের মোবাইল ফোন দিয়ে স্ক্যান করলেই পণ্যটির উৎপাদনের তারিখ, কারখানার নাম, ব্যান্ডরোলের আসল নম্বর এবং ভ্যাট বা সম্পূরক শুল্ক পরিশোধের সমস্ত তথ্য সরাসরি দেখতে পাবেন। এতে সাধারণ মানুষও এই নজরদারির একটি বড় অংশ হয়ে উঠবেন।কাগজের তৈরি সাধারণ ব্যান্ডরোলের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যে জালিয়াতি হতো, তা দূর করতে প্রতিটি ডিজিটাল ব্যান্ডরোলে একটি করে ইউনিক সিরিয়াল নম্বর থাকবে, যা বাজারে একবার ব্যবহৃত বা স্ক্যান হওয়া মাত্রই সরকারি সার্ভারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা ‘ব্যবহৃত’ হিসেবে দেখাবে। একই কোড যদি দ্বিতীয়বার স্ক্যান বা ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়, তবে মূল সিস্টেমে সাথে সাথে একটি সতর্কবার্তা চলে যাবে। এছাড়া এই অবৈধ উৎপাদন ও চোরাচালান সম্পূর্ণ গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, শুল্ক বিভাগ, ভ্যাট গোয়েন্দা, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী টাস্কফোর্স বা যৌথ বাহিনী গঠন করা হবে।প্রযুক্তিগত নজরদারির অংশ হিসেবে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে তামাক কোম্পানির কাঁচামাল আমদানি, তামাক পাতা ক্রয়, ব্যান্ডরোল সংগ্রহের পরিমাণ এবং মাসিক ভ্যাট রিটার্নের সমস্ত তথ্য জমা থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই সমস্ত উপাত্ত সার্বক্ষণিক নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করবে। যদি দেখা যায় কোনো কোম্পানি বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল কিনেও ভ্যাট রিটার্নে কম উৎপাদন দেখাচ্ছে, তবে কম্পিউটার সিস্টেম নিজে থেকেই তাকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেবে। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, কর ফাঁকির এই প্রবণতা কমাতে জটিল শতাংশভিত্তিক কর ব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়ে ধাপে ধাপে একটি নির্দিষ্ট কর পদ্ধতি চালুর কথাও ভাবা হচ্ছে। একই সাথে মাঠপর্যায়ের যেসব কর্মকর্তা এই মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবেন, তাদের প্রশাসনিক চাপ ও প্রভাব থেকে রক্ষা করতে নির্দিষ্ট সময়ের আগে বদলি না করা, আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সফল অভিযানের জন্য বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে এই বিধিমালায়।তবে তামাক খাতের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাঝেও সাধারণ ধূমপায়ীদের জন্য একটি মিশ্র খবর রয়েছে। আগামী বাজেটে সিগারেটের ওপর মূল শুল্কের হার নতুন করে আর বাড়ানো হচ্ছে না। কারণ বর্তমানে খুচরা মূল্যের ওপর প্রায় ৮৩ শতাংশের মতো সর্বোচ্চ করভার ইতিমধ্যেই চাপানো রয়েছে, যা আরও বাড়ানোর সুযোগ খুবই কম। তবে শুল্ক না বাড়লেও আগামী অর্থবছর থেকে বাজারে প্রতি প্যাকেট সিগারেটের দাম স্তরের ওপর ভিত্তি করে বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে দেশে সিগারেটের গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে যে চারটি স্তর প্রচলিত রয়েছে, তার প্রতিটি স্তরেই মূল্যের একটি বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। ফলে শুল্কের হার অপরিবর্তিত থাকলেও সাধারণ ভোক্তাদের আগের চেয়ে অনেক বেশি চড়া মূল্যে বাজার থেকে সিগারেট কিনতে হবে, যা প্রকারান্তরে এই ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল