প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
নবম পে-স্কেলের চাপ শেষ মুহূর্তে পরিচালন ব্যয় বাড়ল ৮ হাজার কোটি
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন এবং ব্যয় সংকোচনের নানামুখী নীতি ও প্রকাশ্য ঘোষণা থাকলেও আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শেষ পর্যন্ত অনুৎপাদনশীল পরিচালন ব্যয়ের লাগাম টানা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বা নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়ায় শেষ মুহূর্তে এসে এই খাতে আরও অতিরিক্ত ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়াতে হয়েছে। এর ফলে সরকারের মোট পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন রেকর্ড। এই বিশাল অঙ্কটি দেশের আগামী অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বা এডিপির দ্বিগুণেরও চেয়ে অনেক বেশি। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন যে, বিশাল আকারের এই অনুৎপাদনশীল পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে একদিকে যেমন দেশের প্রকৃত উন্নয়ন খাত ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর পরিধি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে বাজারে অর্থপ্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির এক নতুন ও সংহারী চাপ তৈরি হতে পারে। তারা সতর্ক করে দিয়ে আরও বলেছেন যে, শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি করলেই হবে না, বরং কর ব্যবস্থার আমূল কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় এবং সরকারি সেবার গুণগত মান বাড়াতে না পারলে বিশাল ঘাটতির এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য এক মহাসংকট বা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।বাজেট প্রণয়নের ইতিহাস ও ভেতরের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, এর আগে মে মাসের শুরুর দিকে যখন আগামী বাজেটের প্রাথমিক রূপরেখা ও খসড়া কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তখন পরিচালন ব্যয়ের জন্য ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার একটি প্রাথমিক প্রস্তাব ছিল। একই সঙ্গে দেশের ভৌত অবকাঠামো ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের পুরো হিসাবনিকাশ ও ছক ওলটপালট হয়ে যায়। খসড়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন এই পে-স্কেলের প্রথম ধাপ মাঠপর্যায়ে কার্যকর করতেই বাজেটে অতিরিক্ত আরও প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার নতুন তহবিলের প্রয়োজন দেখা দেবে। এই বিশাল আর্থিক চাপ সামাল দিতেই শেষ পর্যন্ত মূল বাজেটের পরিচালন ব্যয়ে আরও ৮ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত যুক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেটের মোট আকার ও পরিধি এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায়। অবশ্য অর্থ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলছেন যে, নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে দেশের লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা ও আর্থিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের গতিশীলতা বা ইতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে উৎপাদনশীলতা না বাড়িয়ে কেবল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোগ বা ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়ালে তা দেশের চলমান মূল্যস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ওপর এক নতুন ও অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে।এই সংবেদনশীল ও জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে দেশের সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন যে, বহু বছর ধরে দেশের সরকারি বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের কোনো সমন্বয় বা পরিবর্তন করা হয়নি। বর্তমান বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় বিবেচনা করলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোটা আসলেই এক দিক থেকে যৌক্তিক ও সময়ের দাবি ছিল। তবে তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে মনে করিয়ে দেন যে, এই বিশাল বাড়তি ব্যয়ের বিপরীতে সরকারি দপ্তরগুলোর প্রশাসনিক দক্ষতা, কাজের গতি এবং জনগণের জন্য নাগরিক সেবার মানও সমপরিমাণে বাড়াতে হবে। যদি সেবার মান না বাড়িয়ে শুধু কাগজে-কলমে বেতন বৃদ্ধি করা হয়, তবে তা রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর কেবল খরচের বোঝাই বাড়াবে; কিন্তু দেশের সাধারণ নাগরিকেরা এর থেকে কোনো কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবেন না। তিনি আরও যোগ করেন যে, বর্তমানে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা। যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, তবে এই বিশাল বাড়তি পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে সরকারকে নিরুপায় হয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। আর সরকার যদি নিজেই ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে নেয়, তবে দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ার এক চরম ঝুঁকি তৈরি হবে, যা দেশের শিল্পায়নকে ব্যাহত করবে।এদিকে পরিচালন ব্যয়ের এই লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির কারণে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন খাতের পরিধি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এর ফলে দেশের গ্রামীণ ও নগর অঞ্চলের নতুন নতুন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সরাসরি সরকারি বিনিয়োগের গতি মন্থর হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটি উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ও বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত জরুরি। এই ক্ষতিকর বৈষম্য দূর করে বাজেটে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে মুখে শুধু ঘোষণা দিলেই হবে না, বরং বাস্তবে কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি মেনে চলতে হবে। এ জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল বিদেশ ভ্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা, সরকারি টাকায় নতুন গাড়ি কেনা নিষিদ্ধ করা এবং অনুৎপাদনশীল বিভিন্ন খাতের অপ্রয়োজনীয় খরচ কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। অন্যদিকে, করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খাতের ভর্তুকি ব্যবস্থার টেকসই সংস্কার, এডিপি বা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং টেকসই অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এই প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের বিশিষ্ট চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ সরকারের নীতিগত ত্রুটি তুলে ধরে বলেন যে, এই মুহূর্তে সরকারি ব্যয়ের সার্বিক দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব খাতের ভেতরের কাঠামোগত বড় সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্ব ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যেকোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় বা অপচয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু বরাদ্দের আকার বা বিশালত্ব না বাড়িয়ে ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং দেশের বেসরকারি খাতের জন্য বিনিয়োগবান্ধব ও স্থিতিশীল পরিবেশ ধরে রাখতে সরকারকে যেকোনো মূল্যে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল