প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
শাহজালালে উড়োজাহাজ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে মানছে না ট্র্যাকিং সিস্টেম
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সংরক্ষিত এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহৃত আধুনিক রাডার ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম বা ভিটিএস নামক প্রযুক্তি স্থাপন না করায় চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে উড়োজাহাজের ওঠানামা। বিমানবন্দরে কর্মরত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইনস এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো সেবা প্রদানকারী সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ সংস্থার যানবাহনে এই অত্যাবশ্যকীয় নজরদারি ব্যবস্থা না থাকায় দিন দিন বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। তবে দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা বেবিচক জানিয়েছে, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুসংহত করতে সম্প্রতি তারা এই ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপনের কড়া নির্দেশনা জারি করেছে এবং এর বাস্তবায়ন জোরদার করার জন্য মাঠপর্যায়ে তদারকি শুরু করেছে। সংস্থাটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট অনাগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চূড়ান্তভাবে সতর্ক করে দিয়ে দ্বিতীয় দফায় আইনি চিঠি পাঠানো হয়েছে।বেবিচকের নীতিমালার বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিমানবন্দরের রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোন বা বিমান পার্কিং এলাকার মতো স্পর্শকাতর স্থানে চলাচলকারী প্রতিটি যানবাহনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান, গতি এবং চলাচলের গতিপথ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক ও নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের জন্যই এই আধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা স্থাপন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। প্রথম দফায় বিগত ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এই প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হলেও সিংহভাগ সংস্থাই তা আমলে নেয়নি। এই চরম উদাসীনতার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ মে বেবিচক থেকে পুনরায় আরও একটি কঠোর চিঠি ইস্যু করা হয়। নতুন এই নির্দেশনায় বিভিন্ন এয়ারলাইনস ও অন্যান্য সেবামূলক সংস্থাকে আগামী ১৫ জুনের মধ্যে তাদের প্রতিটি যানবাহনের ক্ষতিকর গতিবিধি রোধে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে এই তীব্র সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই প্রযুক্তি স্থাপন না করার কারণে যদি বিমানবন্দরে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়, তবে তার সব দায়ভার সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও অপারেটরদেরই এককভাবে বহন করতে হবে।বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রধান বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এয়ারসাইড এলাকায় প্রতিদিন শত শত যান্ত্রিক গাড়ি চলাচল করলেও সেগুলোর এক বিশাল অংশ এখনো আধুনিক এই কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে। ট্র্যাকিং সিস্টেম না থাকার কারণে এই গাড়িগুলোর তাৎক্ষণিক গতিবিধি রানওয়ের মূল রাডার বা নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার সময়মতো শনাক্ত করতে পারে না, যা আকাশপথের বিশালাকার বিমান চলাচলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। বেবিচকের প্রযুক্তিগত কর্মকর্তারা বলছেন যে, এই বিশেষ ব্যবস্থাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হলে এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী প্রতিটি অনুমোদিত যানবাহনের গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড আধুনিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে সরাসরি বড় পর্দায় দেখা সম্ভব হবে। এর ফলে কোনো গাড়ি যদি নিজের নির্ধারিত রুট বা পথ থেকে সামান্যতম বিচ্যুত হয়, কিংবা কোনো অননুমোদিত বা নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে এবং কোনোভাবে রানওয়ের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে সাথে সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা বেজে উঠবে এবং বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।কেন্দ্রীয় এই পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করার কাজ বর্তমানে চলমান থাকলেও দীর্ঘ ৫৫ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসেও এই ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ উন্নতি বা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে না পারার কারণে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। বেবিচকের সদস্য এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এই সার্বিক বিষয়ে জানিয়েছেন যে, বিশ্বের উন্নত ও আধুনিক বিমানবন্দরগুলোয় এই ধরনের প্রযুক্তি বহু বছর ধরেই অত্যন্ত সফলতার সাথে ব্যবহার হয়ে আসছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী সব অনুমোদিত যানবাহনকে কেন্দ্রীয়ভাবে নিখুঁত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং প্রতিটি গাড়ির চালকের সাথে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা যাবে, যা বিমান ওঠানামার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বহুগুণ জোরালো করবে।বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড অপারেশনে নিয়োজিত কর্মীরা বলছেন যে, এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদাসীনতার কারণে অতীতে একাধিক ছোট-বড় দুর্ঘটনাও ঘটেছে। যেমন গত বছরের নভেম্বরের দিকে একটি পুশকার্ট বা বিমান ধাক্কা দেওয়ার গাড়ির ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের সামনের চাকা বা নোজ হুইল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার কারণে ওই ফ্লাইটটি বাতিল করতে হয়। তারও আগে ২০২২ সালে বিমান বাংলাদেশের হ্যাঙ্গার থেকে একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ বের করার সময় সেটি সেখানে অবস্থানরত আরেকটি বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজকে সজোরে ধাক্কা দেয়। একই বছর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ট্রলি বিমান বাংলাদেশের অন্য একটি উড়োজাহাজে আঘাত করে। এসব ঘটনায় বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় বা প্রাণহানি না ঘটলেও গ্রাউন্ড অপারেশনে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।অবশ্য এ বিষয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রধান মুখপাত্র বোসরা ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন যে, এই আধুনিক সিস্টেমটি তাদের সব ধরনের গাড়িতে অনেক আগেই সফলভাবে লাগানো হয়েছে এবং বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোন এলাকার পাশাপাশি শহরের অভ্যন্তরে চলাচলকারী গাড়িগুলোকেও এই পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। তবে প্রখ্যাত অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি মনে করেন, রানওয়ে এবং ট্যাক্সিওয়ের মতো সংবেদনশীল এলাকায় প্রতিটি যানবাহনকে প্রযুক্তিনির্ভর কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার বা আইকাও-এর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী আধুনিক প্রতিটি বিমানবন্দরে এই ধরনের ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য। যেহেতু দিনে দিনে গ্রাউন্ড সাপোর্ট যানবাহনের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, সেহেতু তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরনের বিপর্যয় বা বড় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যায়।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল