প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
সৌদিতে বিদেশি কোম্পানির শর্তসাপেক্ষ সম্পত্তি কেনার সুযোগ
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম উম্মাহর কাছে সৌদি আরব অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ এক পুণ্যভূমি। ইসলামের প্রধান দুটি পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার অবস্থান এই দেশটিতে হওয়ায় প্রতিবছর সারা বিশ্ব থেকে লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমান সেখানে পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালন করতে যান। তবে কেবল ইবাদত-বন্দেগির উদ্দেশ্যেই নয়, এখন থেকে চাইলে যেকোনো সাধারণ মানুষ কিংবা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে সেই পবিত্র ভূমিতে নিজেদের নামে স্থায়ী সম্পত্তি বা আবাসন কিনতে পারবেন। সবচেয়ে বড় আশার কথা হলো, সৌদি আরবে আগে থেকে কোনো ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান না থাকলেও এখন যেকোনো বিদেশি নাগরিক এই বিরল সুযোগটি লুফে নিতে পারবেন। তবে আন্তর্জাতিক আইন ও দেশের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে ক্রেতাদের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি শর্ত ও নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।মূলত বিশ্ববাজারের ধনকুবের ও বিদেশি নাগরিকদের সৌদি আরবের আবাসন খাতে বিনিয়োগে বিশেষভাবে উৎসাহিত করতে এবং বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও গতিশীল করতে দেশটির বিনিয়োগ বিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের বার্ষিক নির্দেশিকা তথা ‘ইনভেস্টর গাইড ২০২৬’-এ বেশ কিছু যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এনেছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের বিনিয়োগ মন্ত্রণালয় এই নতুন নীতিমালার বিস্তারিত রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রটির মূল উদ্দেশ্য হলো, সম্পত্তি কেনাবেচার আমলাতান্ত্রিক ও জটিল আইনি প্রক্রিয়াকে সহজ করার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বড় বড় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ নিজেদের দেশে আকর্ষণ করা।ঘোষিত নতুন নিয়ম ও নীতিমালা অনুযায়ী, সৌদি আরবের মাটিতে কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা আবাসন কিনতে আগ্রহী বিদেশি কোম্পানি কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবার আগে তাদের নিজ দেশের সরকার অনুমোদিত মূল বাণিজ্যিক নিবন্ধন সনদ বা ব্যবসার লাইসেন্স জমা দিতে হবে। তবে এই নথিগুলো জমা দেওয়ার পূর্বে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সেটি হলো, মূল নথিটিকে প্রথমে সৌদি সরকার কর্তৃক অনুমোদিত কোনো পেশাদার অনুবাদ কেন্দ্র থেকে নিখুঁতভাবে অনুবাদ করিয়ে নিতে হবে এবং পরবর্তীতে আবেদনকারীর নিজ দেশে অবস্থিত সৌদি আরবের দূতাবাস বা হাইকমিশন থেকে সেটি যথাযথভাবে প্রত্যয়ন বা সত্যায়িত করিয়ে নিতে হবে। এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মূল গঠনতন্ত্র বা অংশীদারিত্বের দলিলাদিও একইভাবে হুবহু অনুবাদ ও দূতাবাসের মাধ্যমে প্রত্যয়ন করে জমা দিতে হবে। সম্পত্তি ক্রয়ে আগ্রহী প্রতিটি কোম্পানিকে সৌদি আরবের স্থানীয় পরিমণ্ডলে কাজ পরিচালনার জন্য একজন বিশ্বস্ত আইনগত প্রতিনিধি নিয়োগ করতে হবে এবং সেই প্রতিনিধি নিয়োগের আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্রটিও একই আইনি প্রক্রিয়ায় অনুবাদ ও সত্যায়িত হতে হবে। শুধু তা-ই নয়, নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য সেই অনুমোদিত প্রতিনিধিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে একটি আমমোক্তারনামা বা আইনি ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে।এর বাইরেও আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে তার নিজ দেশে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসের বিশেষ সহায়তায় একটি অত্যন্ত নিরাপদ ও আধুনিক ডিজিটাল পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে হবে। সব ধরনের আইনি শর্ত ও নিয়ম মেনে সৌদি আরবের বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ে একবার চূড়ান্তভাবে নিবন্ধিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিকানা বা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় হুট করে কোনো ধরনের বড় পরিবর্তন আনা যাবে না। যদি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কোনো পরিবর্তন আনা হয়, তবে পরবর্তী বছরগুলোতে সেই কোম্পানির নিবন্ধন আর কোনোভাবেই নবায়ন করা যাবে না। সম্পত্তি কেনার পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও আধুনিক করতে বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ইলেকট্রনিক পোর্টাল বা ওয়েব মাধ্যমের সাহায্যে ঘরে বসেই এই নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া যাবে।সৌদি আরবের বিনিয়োগ মন্ত্রণালয় থেকে জোরালো দাবি করা হয়েছে যে, দেশের আবাসন খাতে বিদেশি বিনিয়োগকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও সুনিয়ন্ত্রিত রাখতে এবং নতুন বৈশ্বিক বিনিয়োগ আইনের সঙ্গে সব ধরনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এই নতুন নির্দেশিকায় এমন আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, এই নতুন আইনি সংযোজনের ফলে সৌদি আরবের আবাসন ও রিয়েল এস্টেট খাতে বিদেশি পুঁজির এক বিশাল জোয়ার আসবে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে তাদের চিরকালীন তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে এসে অর্থনীতির বহুমুখীকরণের যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, এই সহজ আবাসন নীতি সেই লক্ষ্য অর্জনকে আরও অনেক বেশি ত্বরান্বিত করবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে কঠোরভাবে প্রত্যয়িত হওয়ায় এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করায় এখানে আর্থিক জালিয়াতি বা প্রতারিত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। এই আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়লে সৌদি আরবে নতুন নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ শিল্পে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা দেশটির অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার করবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল