প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
ট্রাম্পের ১ লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসা ফি বাতিল
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভিসা হিসেবে পরিচিত এইচ-১বি ভিসার আবেদন ফি এক লাখ ডলারে উন্নীত করার যে বিতর্কিত নীতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গ্রহণ করেছিল, তা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। আদালত অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, আবেদন ফির নামে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ মূলত একটি ‘কর’ বা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, যা মার্কিন কংগ্রেসের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট নিজের একক ক্ষমতাবলে কোনোভাবেই চাপিয়ে দিতে পারেন না। ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল জেলা আদালতের বিজ্ঞ বিচারক লিও টি. সোরোকিন গত সোমবার এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত সেই নীতিটিকে পুরোপুরি অসাংবিধানিক অ্যাখ্যা দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল সংবিধান অনুযায়ী যেকোনো ধরনের কর আরোপের একচ্ছত্র ও চূড়ান্ত অধিকার কেবল আইনসভা বা কংগ্রেসের রয়েছে। বর্তমান প্রশাসন আইনি মারপ্যাঁচে এই বিশাল অঙ্কের অর্থকে একটি সাধারণ ‘নিয়ন্ত্রক ফি’ হিসেবে দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, আদালতের কাছে এর পক্ষে কোনো যৌক্তিক, প্রশাসনিক বা আইনি ভিত্তি প্রমাণ করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।বিচারক সোরোকিন তার লিখিত পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা এবং আর্থিক খাতের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চালিকাশক্তি শিল্পগুলো দীর্ঘ সময় ধরে এই বিশেষ ভিসার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অথচ এত বড় একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বা নীতি চূড়ান্ত করার আগে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো ধরনের জনমত যাচাই কিংবা সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা পরামর্শ করেনি, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী। অপরদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই নীতির সপক্ষে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দাবি করা হয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল, মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম বেতনে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার কারণে স্থানীয় মার্কিন নাগরিকরা তাদের ন্যায্য কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন এবং দেশের বেকারত্ব বাড়ছে। প্রশাসনের মতে, আবেদন ফি এক লাখ ডলার করা হলে মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ খরচ করে বিদেশ থেকে কর্মী আনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং এর পরিবর্তে তারা উচ্চ বেতনে নিজেদের দেশের নাগরিকদেরই কাজে নিয়োগ দিতে বেশি উৎসাহিত হবে।প্রশাসনের এই বিতর্কিত ও কঠোর নীতিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পর গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি অঙ্গরাজ্যের একটি শক্তিশালী জোট একতাবদ্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয় এবং যৌথভাবে একটি মামলা দায়ের করে। মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর মূল যুক্তি ছিল, এই আকাশচুম্বী ফি কার্যকর করা হলে দেশের ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন অলাভজনক সমাজকল্যাণমূলক সংস্থার পক্ষে বিশ্ববাজার থেকে দক্ষ বিদেশি কর্মী বা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে মার্কিন সমাজে দক্ষ চিকিৎসক, অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং উচ্চপর্যায়ের বিজ্ঞান গবেষকদের এক তীব্র ও নজিরবিহীন সংকট তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করবে। আদালতের এই রায়ের পর গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন হাজার হাজার এই বিশেষ ভিসাধারী চিকিৎসক, শিক্ষক ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীরা নিউইয়র্কসহ পুরো দেশের সাধারণ মানুষকে অক্লান্ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আদালতের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত একটি অত্যন্ত দরকারি ও মানবিক কর্মসূচিকে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করল।তবে অভিবাসন সংক্রান্ত এই আইনি লড়াই এখনই পুরোপুরি থেমে যাচ্ছে না, বরং এটি আরও বড় রূপ নিতে পারে। কারণ এর আগে ওয়াশিংটনের অন্য একটি ফেডারেল আদালতের বিচারক একই বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। সেই আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, দেশের সার্বিক অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত বিস্তৃত ও বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ভিন্ন আদালতের এমন সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও ভিন্নধর্মী অবস্থানের কারণে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য দেশটির সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনা শতভাগ। ইতিমধ্যেই হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই জেলা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্টের প্রধান মুখপাত্র টেইলর রজার্স দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থে যেকোনো শ্রেণির বিদেশি নাগরিকের দেশে প্রবেশ সীমিত বা নিয়ন্ত্রণ করার আইনি ক্ষমতা সংবিধানে প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে এবং তারা উচ্চ আদালতের আপিলে নিশ্চিতভাবে জয়লাভ করবেন বলে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল