প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
তনু হত্যা মামলায় দুই সাবেক সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে রেড নোটিশের নির্দেশ
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের মেধাবী ছাত্রী ও স্থানীয় নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার প্রধান দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তি, তথা অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান এবং সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে লাল নোটিশ বা রেড নোটিশ জারির সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মুমিনুল হক এই আদেশ প্রদান করেন। আদালতের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের বিষয়টি সোমবার রাতে গণমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা আদালত পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ। এই আদেশের ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তনু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া আবার নতুন গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলম ইতিমধ্যেই আইনি জটিলতা এড়াতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে পালিয়ে গেছেন। অন্যদিকে, অপর প্রধান সন্দেহভাজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান বর্তমানে কোথায় আত্মগোপন করে আছেন বা কোন দেশে পালিয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনো মেলেনি। তবে এই লোমহর্ষক মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি হাফিজুর রহমান বর্তমানে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কুমিল্লা সেনানিবাসের স্ট্যাটিক সিগন্যালের সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার এবং টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হোগড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. হাফিজুর রহমানকে হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর তনু হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য হাতে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে প্রধান দুই সন্দেহভাজন জাহিদুজ্জামান ও শাহিন আলমের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি এবং এই অপরাধের সাথে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার বেশ কিছু অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই বাস্তবতায়, বিদেশে পলাতক এই দুই আসামিকে দ্রুত দেশের মাটিতে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞ বিচারক মুমিনুল হক তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির জন্য মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলামকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।এর আগে, গত ২২ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশ পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারকৃত আসামি হাফিজুর রহমানকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়েছিলেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত ওই সেনাসদস্যের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এরপর তাকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইয়ের রাজধানীর কল্যাণপুরে অবস্থিত বিশেষ ইউনিটের কার্যালয়ে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গত ২৫ এপ্রিল তাকে পুনরায় কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং তখন থেকেই তিনি কারাগারের অন্ধকক্ষে আছেন। পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম মামলার নিয়মিত কার্যক্রমের বিষয়ে জানান, সোমবার মামলার পূর্বনির্ধারিত তারিখ থাকায় কারাবন্দি হাফিজুর রহমানকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাকে আবারও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তিনি আরও যোগ করেন যে, পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা বাকি সন্দেহভাজন আসামিদের যেকোনো মূল্যে আইনের আওতায় আনতে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।উল্লেখ্য, আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের অভ্যন্তরের একটি বাসায় ছাত্র পড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হন কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। সেনানিবাসের মতো একটি সুরক্ষিত এলাকার ভেতরে এমন নিখোঁজের ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে একটি নির্জন ঝোপের মধ্যে তনুর ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এই নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল গোটা দেশ, খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে টানা আন্দোলন করেছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা সেই মামলার তদন্তে ইন্টারপোলের এই রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ভুক্তভোগী পরিবারের মনে নতুন করে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা জাগিয়েছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল