প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় ঝুঁকছে দেশ বাদ পড়তে যাচ্ছে ছয় অনার্স কোর্স
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বেশি কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে এক আমূল পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের রদবদল আসতে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের মতো প্রায় ছয়টি চিরাচরিত বিষয়ের একক অনার্স কোর্স বাতিল করার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এই বিষয়গুলোকে একেবারে বাদ না দিয়ে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় বা একীভূত করা হবে। মূলত তত্ত্বীয় শিক্ষার চেয়ে কর্মমুখী শিক্ষার ওপর বেশি জোর দিতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর বিপরীতে বর্তমান যুগের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার পরিধি ব্যাপক হারে বাড়ানো হচ্ছে। শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব কর্মসংস্থানের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, আউটসোর্সিং বা তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজের মতো নানাবিধ দক্ষতা উন্নয়নমূলক বিষয়। শুধু তা-ই নয়, কলেজ জীবন থেকেই শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্তপেশার বিশেষ প্রশিক্ষণ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার সেন্টার বা কর্মমুখী পরামর্শ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে এবং বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের বাজারে টিকে থাকার জন্য শিক্ষার্থীদের অন্তত সাতটি আন্তর্জাতিক বা বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ করে দেওয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক নীতিউর্ধতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই খসড়া প্রস্তাবটি নিয়ে এখনো বিভিন্ন স্তরে বিস্তারিত আলোচনা চলছে এবং সংশ্লিষ্ট সবার মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী সনদসর্বস্ব বা ডিগ্রিভিত্তিক পড়াশোনার পরিবর্তে বাস্তবমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষতাভিত্তিক একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনও এই সুরেই কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, সরকার এমন একটি গতিশীল শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চায় যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু কাগজের ডিগ্রি বা বড় সার্টিফিকেট অর্জন করবে না, বরং প্রত্যেকে একেকজন দক্ষ, যোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি হবে।দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোর সমালোচনা করে আসছিলেন। তাদের মতে, আমাদের দেশের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তরুণদের কর্মসংস্থানের বাজারের সঙ্গে কোনো বাস্তব সংযোগ তৈরি করতে পারছে না। ফলে পড়ালেখা শেষ করেও যোগ্য কাজের অভাবে প্রতি বছর শিক্ষিত ও কর্মক্ষম তরুণেরা বেকারত্বের অভিশাপ ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এক বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকার থাকার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এবং গত তেরো বছরে এই হার প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় পঁচাশি শতাংশ কর্মসংস্থানই এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল, যার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারীরা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পায় না। এই ব্যবধান ঘুচাতেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দেশের সবচেয়ে বড় দুটি পাবলিক পরীক্ষা, তথা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিষয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বা এনসিটিবি ইতিমধ্যেই এই সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক ধারণাপত্র ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এনসিটিবির সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে একটি এসএসসি পরীক্ষা শেষ করতে ২৫ থেকে ৩০ কর্মদিবস এবং এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করতে ৩০ থেকে ৩৫ কর্মদিবস বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় জুড়ে দেশের হাজার হাজার নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে হয়, যার কারণে সাধারণ স্কুল-কলেজগুলোতে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকে। এতে অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাৎসরিক পড়াশোনার নির্দিষ্ট ঘণ্টা বা শিখন সময় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর পাশাপাশি মাসের পর মাস পরীক্ষার পেছনে ব্যয় করায় পরীক্ষার্থীরা নিজেরাও এক অসহনীয় মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে দিন পার করে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত জটলা ও শিক্ষার্থীদের মনের ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপ কমানোই সরকারের এই নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০২৮ সাল থেকে দেশে একটি সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম বা পাঠ্যসূচি চালু করার জোরালো পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই নতুন শিক্ষাক্রমে সম্পূর্ণ নতুন চারটি বিষয় যুক্ত করার কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানিয়েছেন। নতুন এই রূপরেখা অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ক্রীড়া এবং সংস্কৃতির মতো দুটি স্বতন্ত্র বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে। আর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ এবং পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করার জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দের সাথে শেখা নামক বিশেষ একটি বিষয়। এছাড়াও নতুন এই শিক্ষাক্রমে প্রচলিত বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ভাষা শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। এর জন্য বর্তমান পাঠ্যবইয়ের যেকোনো একটি বিষয়ের সঙ্গে বিদেশি ভাষা শেখার একটি বড় ও বিস্তারিত অধ্যায় জুড়ে দেওয়া হতে পারে। সম্প্রতি সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নতুন শিক্ষাক্রমের এই সুদূরপ্রসারী ও নানামুখী পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, প্রথম পদক্ষেপে বিদ্যমান বা চলমান শিক্ষাক্রমকে বর্তমান সময়ের আলোকে সঠিকভাবে পরিমার্জন ও সংশোধন করে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া হবে। আর পাঠ্যক্রমের যে আমূল বা সামগ্রিক পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, তার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং সাধারণ মানুষ এর বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাবেন ২০২৮ সালে গিয়ে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, এবারের নতুন কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রম অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও যুগোপযোগী হচ্ছে, যা দেশের যুবসমাজকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যোগ্য করে তুলবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনও নতুন শিক্ষাক্রমে এই নতুন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি দেশের বিদ্যমান সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন যে, বিগত দীর্ঘ ষোলো বছরের পুঞ্জীভূত সব সমস্যা হয়তো এক দিনে বা এক বছরে রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা রয়েছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে যতটা দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় সব পরিবর্তন আনা হবে। শিক্ষাক্রমের ভেতরে যেখানে যেখানে সংযোজন, বিয়োজন কিংবা পরিমার্জন প্রয়োজন, তা করার পাশাপাশি এই যুগের উপযোগী নতুন বিষয়গুলোকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার সুযোগ পায়।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল