প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
এআই প্রসঙ্গে একে আজাদ: আমিও তো ১০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করব
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, বর্তমান বিশ্ব যেভাবে প্রযুক্তির হাত ধরে দ্রুত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, বাংলাদেশ কিন্তু সেই তুলনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমান বিশ্ববাজার মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নিজেদের নির্ভরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ইতিমধ্যেই অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা পণ্যের দাম কোনোভাবেই বাড়াবেন না। এই পরিস্থিতিতে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে উৎপাদন খরচ কমানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। আর সেই উদ্দেশ্য সফল করতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে কারখানার অতিরিক্ত জনবল বা শ্রমিক সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। নিজের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে এই শীর্ষ ব্যবসায়ী জানান, তাঁর গ্রুপে বর্তমানে প্রায় পঁচাত্তর হাজার স্থায়ী কর্মী কাজ করছেন, যেখান থেকে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে আগামী দিনে অন্তত দশ হাজার কর্মী ছাঁটাই বা কমানোর একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন তিনি।একটি জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশনের নিয়মিত ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় এই শিল্প উদ্যোক্তা এমন বিস্ফোরক ও চিন্তোদ্দীপক মন্তব্য করেন। বিশিষ্ট গণমাধ্যমকর্মী ইকবাল আহসানের সঞ্চালনায় আয়োজিত ওই বিশেষ আলোচনায় তিনি দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতের এক অন্ধকার বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। এ কে আজাদ অত্যন্ত যৌক্তিক একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, যে ১০ হাজার কর্মীকে কারখানা থেকে বাদ দেওয়া হবে, তারা কিন্তু পুরোপুরি অদক্ষ নন, বরং দীর্ঘ দিন কাজ করার কারণে তারা যথেষ্ট দক্ষ ও অভিজ্ঞ। তারা এত দিন নিয়মিত কর্মসংস্থানে নিয়োজিত ছিলেন। ফলে হঠাৎ করে প্রযুক্তির আগ্রাসনে কাজ হারালে এই বিশাল দক্ষ জনগোষ্ঠী আসলে যাবে কোথায় এবং কীভাবে তাদের জীবিকা নির্বাহ হবে, তা এক মস্ত বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করবে। আর এই কারণেই দেশের সরকারকে আরও বেশি দূরদর্শী হতে হবে এবং জাতীয় বাজেটে এই ধরনের উদীয়মান সংকট মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে।বর্তমান অভ্যন্তরীণ বাজারের করুণ দশা উল্লেখ করে এই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জানান, বৈশ্বিক মন্দা এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে দেশের অনেক নামিদামি কোম্পানি ও কারখানা ইতিমধ্যে পুরোপুরি বসে গেছে এবং দেউলিয়া হওয়ার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তারা পণ্যের কাঙ্ক্ষিত মূল্য নিশ্চিত করতে পারছে না, কারখানার অভ্যন্তরীণ কার্যদক্ষতাও আশানুরূপ বাড়ছে না, অথচ এর বিপরীতে তাদের গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং কাঁচামালসহ সব ধরনের পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এই তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে প্রতি মাসেই দেশের কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো উৎপাদনমুখী কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, এটি কেবল তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য প্রযোজ্য নয়, বরং দেশের অন্যান্য খাতের ভারী ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোও একই রকম ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়ে বন্ধের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি বিশ্ববাজারের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের উৎপাদনশীলতা ও কার্যদক্ষতা বৃদ্ধি করতে না পারে, তবে আগামী দিনে বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকা বা টিকে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেশের এক কোটি বেকার মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব অর্থে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান তো বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা এবং শিল্পপতিদের মাধ্যমেই নিশ্চিত করতে হবে। অথচ বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করার জন্য যে ধরনের আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন, তা মাঠপর্যায়ে অনুপস্থিত। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে তারা ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে অনুরোধ করে এসেছেন যেন ব্যাংক ঋণের সুদের হার অতি দ্রুত কমিয়ে আনা হয়। কারণ বর্তমানে দেশে প্রচলিত ১৩ থেকে ১৪ শতাংশের মতো চড়া ও আকাশচুম্বী সুদের হার মাথায় নিয়ে কোনো সুস্থ ও লাভজনক শিল্পকারখানা পরিচালনা করা অসম্ভব। এই চড়া সুদের কারণে নতুন বিনিয়োগ যেমন থমকে গেছে, তেমনি পুরোনো কারখানাগুলো সচল রাখাও এক মস্ত বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই দূরদর্শী শিল্প উদ্যোক্তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আমাদের অবশ্যই একটি শক্তিশালী রপ্তানিমুখী শিল্প খাত রয়েছে, যা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে আনে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের অভ্যন্তরীণ যে অর্থনীতি বা লোকাল মার্কেট রয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর শতকরা ৮৫ ভাগের চেয়েও অনেক বেশি বড় ও শক্তিশালী। তাই কেবল রপ্তানি খাতের দিকে নজর দিলেই হবে না, বরং দেশের ভেতরের এই বিশাল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেও সমানভাবে চাঙ্গা ও গতিশীল করতে হবে। দেশের সাধারণ মানুষের ভেতরের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের যে বিশাল চাহিদা রয়েছে, তা যদি আমরা দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে সঠিকভাবে মেটাতে চাই, তবে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ সব ধরনের শিল্পকে বাঁচাতে সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরি।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল