প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় দুর্ঘটনা ডেটাবেজ গঠনের উদ্যোগ
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
বাংলাদেশের সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধে উন্নত বিশ্বের আধুনিক ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বা নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার মডেলে একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প নামের এই বিশেষ উদ্যোগের আওতায় দেশে প্রথমবারের মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করার জন্য একটি জাতীয় ক্র্যাশ ডেটাবেজ প্রস্তুত ও প্রয়োগের কাজ শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের দুটি প্রধান মহাসড়কের মোট একশত চল্লিশ কিলোমিটার অংশকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করিডোরে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় পাঁচশত কিলোমিটার মহাসড়কে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা ফিচার বা সংকেত স্থাপন, প্রায় ষাট হাজার পেশাদার গাড়িচালককে উন্নত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রদান এবং দেশজুড়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি দুর্ঘটনাত্তোর জরুরি সেবা উন্নত করতে হাইওয়ে পুলিশের জন্য আশিটি বিশেষ টহল মোটরসাইকেল, সাধারণ মানুষের জরুরি চিকিৎসায় ষাটটি জীবন রক্ষাকারী প্রাথমিক অ্যাম্বুলেন্স এবং ঢাকা মহানগরীর জন্য আরও চল্লিশটি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।এই সমন্বিত মহাপরিকল্পনাটি সরকারের চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা তথা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ পুলিশ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ অংশগ্রহণে বাস্তবায়িত হচ্ছে। শুরুতে এই প্রকল্পের সামগ্রিক প্রাক্কলিত বাজেট প্রায় চার হাজার নয়শত আটাশ কোটি টাকা ধরা হলেও পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাজেট পুনর্নির্ধারণ করে দুই হাজার আটশত কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। বাজেট কমে যাওয়ার কারণে প্রকল্পের পরিধি এক হাজার কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ছয়শত চল্লিশ কিলোমিটারে সীমিত করা হয়েছে এবং পরামর্শক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও কিছুটা কাটছাঁট করা হয়েছে। প্রকল্পের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই বাজেট হ্রাসের পরও মূল লক্ষ্যগুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে এবং বর্তমানে প্রকল্পের সবচেয়ে জটিল অংশ তথা কেনাকাটা ও চুক্তি সম্পাদনের প্রায় নব্বই শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি মাত্র চার দশমিক তেতাল্লিশ শতাংশ, তবে আগামী দুই মাসের মধ্যে সড়কের বুকে দৃশ্যমান ভৌত বা অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজ শুরু হয়ে যাবে। এই পাইলট মডেলটি যদি সফল ও ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়, তবে পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দেশের সবকটি জাতীয় মহাসড়কে এই আধুনিক ব্যবস্থা অনুকরণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।বাস্তবায়নকারী প্রধান সংস্থা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের দায়িত্বে থাকা একশত চল্লিশ কিলোমিটার পাইলট করিডোরের মধ্যে রয়েছে জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত সত্তর কিলোমিটার এবং নাটোর থেকে গোদাগাড়ী পর্যন্ত সত্তর কিলোমিটার মহাসড়ক। এই উভয় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অংশকে আধুনিক ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার আওতায় এনে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই পুরো ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থাটি মূলত একটি সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা শনাক্তকরণ ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হবে। এ ছাড়া জয়দেবপুর থেকে রাজশাহী, জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ, হাটিকুমরুল থেকে রংপুর এবং ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার মোট পাঁচশত কিলোমিটার মহাসড়কের প্রযোজ্য অংশে আন্তর্জাতিক মানের সড়ক নিরাপত্তা ফিচার স্থাপনের জন্য চুক্তি সম্পন্ন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মাধ্যমে দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি চিকিৎসাসেবার আওতায় আসবে মোট ছয়শত চল্লিশ কিলোমিটার এলাকা। একই সাথে দেশের হাইওয়েগুলোর জ্যামিতিক নকশা আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার কাজও এগিয়ে চলছে।এদিকে চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মে মাস থেকে প্রায় ষাট হাজার চালকের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে গত পবিত্র ঈদের সময় থেকেই বিভিন্ন প্রচারণামূলক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের কাজ শুরু করা হয়েছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া চলছে। একই সাথে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠনের আইনি ও কাঠামোগত প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। হাইওয়ে পুলিশের আধুনিকায়নে ইতিমধ্যে আশিটি টহল মোটরসাইকেল সরবরাহ করা হয়েছে এবং পুলিশ সদস্যদের জন্য একটি আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের নকশা সম্পন্ন করে তার ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে দুর্ঘটনাকবলিত মানুষকে দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে একটি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যার অধীনে চলতি সপ্তাহেই ষাটটি জীবন রক্ষাকারী অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রোটোকল তৈরি এবং ডাক্তার ও নার্সদের বিশেষ ট্রমা লাইফ সাপোর্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকার মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল এবং রাজশাহী জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোকে আধুনিক ও ট্রমা সেন্টারে রূপান্তর করার কাজ চলমান রয়েছে।সড়কের এই বিশাল প্রকল্পটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় দেশের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা ও হতাহতের ভয়াবহ পরিসংখ্যানে। বিভিন্ন বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর সাত থেকে নয় হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং আহত হচ্ছে আরও ১৫ থেকে ১৬ হাজার মানুষ। সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ-এর নিজস্ব তথ্যমতে, বিগত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে পাঁচ হাজার চারশত নব্বই জনের মৃত্যু হয়েছে, যা সরকারি হিসাবে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। বেসরকারি সংস্থাগুলো দাবি করছে যে, কেন্দ্রীয় কোনো নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক ডেটাবেজ না থাকায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি। তবে সব মহলের হিসাবেই এটি স্পষ্ট যে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও তাতে হতাহতের হার ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী ও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতায় দেশের বিশিষ্ট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেবল কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা নতুন কর্র্তৃপক্ষ গঠন করলেই সড়কে পুরোপুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। তাদের মতে, দুর্ঘটনা-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমানোর মূল কারণগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। এর জন্য সড়কে ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, ভুয়া লাইসেন্স উচ্ছেদ করে দক্ষ চালক তৈরি করা এবং সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে পুলিশ ও বিআরটিএ-সহ সব সংস্থাকে আরও সক্রিয় ও সমন্বিত উপায়ে কাজ করতে হবে। একই সাথে নতুন কোনো দুর্ঘটনা ডেটাবেজ চালুর আগে পূর্বের অকার্যকর হয়ে পড়া সিস্টেমগুলোর ত্রুটি দূর করে নতুন ডেটাবেজটিকে আন্তর্জাতিক মানের তথ্যসমৃদ্ধ ও বিজ্ঞানভিত্তিক করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল