প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
কুড়িগ্রামে পুশইন ঠেকাতে বিজিবির সঙ্গে পাহারায় গ্রামবাসী
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বকবান্দা ও ঝাউবাড়ি সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে অবৈধভাবে পুশইন তথা বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়ার এক মারাত্মক অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। তবে ভারতের এই বেআইনি অনুপ্রবেশের চেষ্টা সফল হতে দেয়নি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। বিএসএফের এই পুশইনের তৎপরতা রুখে দিতে স্থানীয় সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত রেখায় অত্যন্ত শক্ত ও অভেদ্য অবস্থান নেয় বিজিবি জওয়ানরা। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবি ও সীমান্তবর্তী গ্রামবাসীর এই ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে অবশেষে পিছু হটতে বাধ্য হয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এই ঘটনার পর থেকে পুরো সীমান্তজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।বিজিবি এবং স্থানীয় সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে জানা গেছে, গত শনিবার গভীর রাতে বকবান্দা ও ঝাউবাড়ি সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় মানুষকে জড়ো করে বিএসএফ। এরপর ভারতের সীমান্তরক্ষীরা অত্যন্ত গোপনে তাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পুশইন করার চেষ্টা চালায়। সীমান্তে সন্দেহজনক আনাগোনা এবং বিএসএফের এই গোপন তৎপরতার খবর মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং স্থানীয় শত শত গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তে এক প্রতিরোধ ব্যূহ তৈরি করেন। বিজিবি ও গ্রামবাসীর এই শক্ত অবস্থানের কারণে গভীর রাতে বিএসএফ তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার পর নতুন করে পুশইনের যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে এবং সীমান্তের সাধারণ মানুষকে সার্বক্ষণিক সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে পুরো রৌমারী সীমান্ত এলাকায় বিজিবির পক্ষ থেকে বিশেষ মাইকিং করা হয়।শনিবার রাতের ওই উত্তেজনার পর পুরো রবিবার দিনভর সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে এবং থমকে ছিল। বকবান্দা ও ঝাউবাড়ি সীমান্তের দুই পাড়েই এক ধরনের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও সতর্কতা পরিলক্ষিত হয়। এর পর রবিবার সন্ধ্যার ঠিক পরপরই বিএসএফ আবারও একই কৌশল অবলম্বন করে ওই দুটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে পুনরায় পুশইনের এক মরিয়া চেষ্টা চালায়। কিন্তু আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে থাকা বিজিবি জওয়ান এবং প্রতিরোধকামী গ্রামবাসীর তীব্র বাধার মুখে পড়ে তাদের সেই দ্বিতীয়বারের চেষ্টাও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তবে সীমান্ত পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের ধারণা, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা এখনই হাল ছাড়বে না, বরং সুযোগ পেলেই তারা আবারও যেকোনো সময় এই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা চালাতে পারে।বকবান্দা গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী বাসিন্দা মঞ্জুরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, শনিবার বিএসএফ কয়েকজন মানুষকে জোরপূর্বক পুশইন করার উদ্দেশ্যে একদম সীমান্ত রেখার কাছে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু বিজিবি এবং গ্রামের সাধারণ মানুষ ঘুম না ঘুমিয়ে সতর্ক পাহারায় থাকায় তারা সেই উদ্দেশ্যে সফল হতে পারেনি। রবিবার সন্ধ্যায় তারা আবারও একই ধরনের ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। তাঁর মতে, সীমান্তে শান্তি বিনষ্ট করে একটি বড় ধরনের ঝামেলা বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে ভারতীয় বাহিনী। মশিউর রহমান নামের আরেকজন স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন যে, দুই দশক আগে রৌমারীর বড়াইবাড়ী সীমান্তে তৎকালীন বিডিআরের কাছে বিএসএফের যে শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল, সেই ঐতিহাসিক ক্ষোভ থেকে এই এলাকায় তারা বারবার উত্তেজনা তৈরি করার চেষ্টা করে আসছে। গত বছরও তারা ১৪ জন মানুষকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল এবং এখন আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, সীমান্তবাসী দেশের মাটি রক্ষায় জীবন দিতে প্রস্তুত, তবুও ওপার থেকে একটা মানুষকেও অবৈধভাবে এই দেশের মাটিতে পুশইন করতে দেওয়া হবে না।এই সীমান্ত উত্তেজনার বিষয়ে বিজিবির একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, বিএসএফ বকবান্দা ও ঝাউবাড়ি সীমান্তে অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা চালিয়ে আমাদের জওয়ানদের প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ নস্যাৎ করতে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি এবং স্থানীয় গ্রামবাসী রাত জেগে যৌথভাবে পাহারা দিচ্ছে, যাতে ওপার থেকে কোনো অপরাধী বা অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তি অনুপ্রবেশ করতে না পারে। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিজিবির এই কর্মকর্তা একটি বড় সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, সীমান্ত এলাকার রাস্তাঘাটের চরম বেহাল দশা এবং ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে খবর পাওয়ার পর অনেক সময় বিজিবি টহল দলের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এই অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি সর্বোচ্চ ত্যাগ ও সতর্কতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল