প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
জেল থেকে আসামি এনে পুশইনের চেষ্টা বিএসএফের
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে ক্ষমতার পালাবদলের এক মাস পেরোতে না পেরোতেই রাজ্যটির সীমান্ত রাজনীতিতে এক নতুন এবং অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর মোড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও বাদানুবাদ তৈরি হয়েছে। একদিকে নির্বাচনের আগে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব বিশেষ করে অমিত শাহ এবং শুভেন্দু অধিকারীর দেওয়া ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গা তাড়ানোর’ কড়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য উগ্র সমর্থকদের পক্ষ থেকে জোর দাবি উঠেছে; অন্যদিকে নবগঠিত এই সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মৌলিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, যেমন নিয়মিত নামাজ আদায় ও আসন্ন কোরবানির আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ করা এবং বুলডোজার দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো অতি কঠোর ও পক্ষপাতমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকদের মতে, রাজ্যের সাধারণ মানুষের কল্যাণে কোনো বড় ধরনের গঠনমূলক কাজের বদলে কেবল একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংককে সন্তুষ্ট রাখতেই বর্তমান সরকার এই ধরনের উসকানিমূলক ও বিভাজনের রাজনীতির আশ্রয় নিচ্ছে।তবে সব কিছুকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর খবরটি উঠে আসছে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যকার সীমান্ত এলাকাগুলো থেকে। রাজ্যের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে বর্তমান প্রশাসন এক অদ্ভুত সংকটে পড়েছে। বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তল্লাশি চালিয়ে তারা প্রতিশ্রুতি মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী খুঁজে পাচ্ছে না। এমতাবস্থায় জনতাকে দেওয়া নিজেদের প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক মুখ রক্ষা করতে প্রশাসন এখন এক অভিনব ও অনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের একটি মহলের ইশারায় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সংশোধনাগার বা কারাগারে দীর্ঘ দিন ধরে বন্দি থাকা আসামিদের অত্যন্ত গোপনে জেল থেকে বের করে সীমান্ত এলাকায় এনে জড়ো করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে রাতের আঁধারে বা সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ বা পুশব্যাক করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি ভারতীয় বিএসএফের সহায়তায় চালানো এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশের চেষ্টা অত্যন্ত কঠোর ও দৃঢ় হাতে রুখে দিচ্ছে। ফলে সীমান্তজুড়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও বিজিবির মধ্যে এক ধরনের তীব্র উত্তেজনা এবং সামরিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। ওই পুলিশ কর্মকর্তার সূত্রের আরও দাবি, বিজিবির কঠোর বাধার মুখে বাংলাদেশে পুশ ইন করতে ব্যর্থ হলে কয়েক দিন পর সেই কারাবন্দি আসামিদের সীমান্ত থেকে সরিয়ে পুনরায় লোকালয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, যা সামগ্রিক সীমান্ত নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের তামাশায় পরিণত করেছে।এই চরম সীমান্ত উত্তেজনার সমান্তরালেই আড়ালে উঠে আসছে আন্তর্জাতিক মহলের আরও কিছু গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ষড়যন্ত্রের গোপন তথ্য। একদিকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোগীরা ভারতের নিউটাউন কিংবা দিল্লির মতো উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত জায়গায় সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছেন; অন্যদিকে বাংলাদেশে নতুন করে ব্যাপক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির একটি গভীর আন্তর্জাতিক নীলনকশার কথা ফাঁস করেছেন ভারতেরই এক প্রাক্তন উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তাঁর দেওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকরা এই মুহূর্তে বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফেরাতে সরাসরি তৎপর না হলেও, সীমান্ত পার করে কিছু বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গোপন চর বা ছদ্মবেশী অপরাধীকে সে দেশে অনুপ্রবেশ করাচ্ছে। এই প্রশিক্ষিত অনুপ্রবেশকারীরা বাংলাদেশে ঢুকে বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করার ছক কষছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।ওই প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও একটি বিস্ফোরক দাবি করে জানিয়েছেন যে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এবং পশ্চিমা কিছু প্রভাবশালী দেশের প্রচ্ছন্ন বা পরোক্ষ সমর্থনে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম ও তার আশপাশের পার্বত্য অঞ্চলকে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নতুন বাফার রাষ্ট্র তৈরির গোপন খসড়া বা নীলনকশাও ইতিমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের এই মারাত্মক রাজনৈতিক টানাপোড়েন, গোপন সামরিক চাল এবং দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি বলির পাঁঠা হচ্ছেন সীমান্ত এলাকার সাধারণ ও নিরীহ বাসিন্দারা। ভারতের সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তারা চরম আতঙ্ক, ভয় ও গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় সীমান্তবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, তারা দিন আনা দিন খাওয়া সাধারণ মানুষ এবং এত বড় রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক কূটনীতি তারা বোঝেন না। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে তাদের গ্রামে এবং সীমান্তে যেভাবে বিএসএফ ও বিজিবির সাঁড়াশি তৎপরতা, টহল ও অস্ত্রের মহড়া বেড়েছে এবং সেই সাথে এলাকায় অচেনা-অজানা লোকজনের সন্দেহজনক আনাগোনা দেখা যাচ্ছে, তাতে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, যাতায়াত এবং মাঠে গিয়ে চাষাবাদ করার পরিবেশ পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে। সীমান্তজুড়ে সারাক্ষণ একটি থমথমে এবং আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কায় দিন গুনছেন তারা। এই নতুন ও বিতর্কিত রাজনৈতিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপ আগামী দিনে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ঠিক কতটা মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে দুই দেশের সচেতন মহলে এখন গভীর উদ্বেগ ও সংকটের কালো মেঘ দেখা দিয়েছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল