প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
ইসরাইলি গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ পেন্টাগনের
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইসরাইলের গোপন নজরদারি এবং গুপ্তচরবৃত্তির তৎপরতাকে এখন সবচেয়ে বড় ও উদ্বেগজনক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। ওয়াশিংটনের কৌশলগত ও সামরিক নীতিনির্ধারণী মহলে এই গুপ্তচরবৃত্তির ভয়াবহতা এতটাই তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে যে, সম্প্রতি এই সংক্রান্ত হুমকির মাত্রাকে পূর্বের 'উচ্চ' বা সাধারণ সতর্কতার স্তর থেকে এক লাফে 'আশঙ্কাজনক' শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে। আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজে প্রথম এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি ফাঁস করা হয়। এর পর পরই নিউ ইয়র্ক টাইমসে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়। পেন্টাগনের অধীনস্থ প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বা ডিআইএ ইসরাইলি গুপ্তচরবৃত্তির এই নতুন মাত্রাকে তালিকাভুক্ত করে তাদের দেশের সমস্ত সংবেদনশীল দপ্তরে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। মূলত ওয়াশিংটনের শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর ইসরাইলের নজরদারি এবং আড়ি পাতার চেষ্টা নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইরানে চলমান সামরিক সংঘাত থামানোর বিষয়ে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন গোপনে কী ধরনের রণকৌশল বা পরিকল্পনা ভাবছে, তা আগাম জানার জন্যই ইসরাইল এই মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।কূটনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের এক জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়ে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর একটি বিশেষ সামরিক অভিযান বা আগ্রাসন শুরু করেছিল। তবে এই অভিযানের ভবিষ্যৎ এবং লক্ষ্য নিয়ে শুরু থেকেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে প্রকাশ্যেই তীব্র মতপার্থক্য ও দ্বিমত দেখা দেয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেখানে ইরানে চলমান এই ব্যয়বহুল সামরিক সংঘাতের দ্রুত একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাপ্তি চাচ্ছেন, যার অংশ হিসেবে গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিও কার্যকর রয়েছে; ঠিক সেখানেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই যুদ্ধবিরতি অগ্রাহ্য করে যেকোনো উপায়ে সংঘাতের আগুন আবারও জ্বালিয়ে তুলতে ইচ্ছুক। এই কৌশলগত মতভেদের কারণেই আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের গোপন আলোচনার তথ্য চুরি করতে ইসরাইল তার গোয়েন্দা তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আমেরিকায় ইসরাইলিদের গুপ্তচরবৃত্তি চালানোর ইতিহাস বহু পুরোনো হলেও, ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে এই ধরনের অনৈতিক তৎপরতা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি ডিআইএ-এর রাডারে ধরা পড়ে। ওই সময় গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের নির্বিচার সামরিক অভিযানের রাশ টেনে ধরতে এবং সাধারণ মানুষের ওপর গণহত্যা বন্ধ করতে তেল আবিবের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছিল তৎকালীন জো বাইডেনের প্রশাসন। পরবর্তীতে ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পরও ইসরাইলের এই গোপন নজরদারির ধারা একইভাবে অব্যাহত থাকে।মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, পেন্টাগনের শীর্ষ নীতিনির্ধারক এলব্রিজ কোলবি এবং তার প্রধান সহকারী চতুর্থ মাইকেল ডিমিনোর মতো অতি সংবেদনশীল পদের কর্মকর্তাদের ওপর ইসরাইলি গোয়েন্দারা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছিল। উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার ঠিক আগে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যে অত্যন্ত গোপনীয় পরমাণুবিষয়ক ও কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, সেখানে আমেরিকার পক্ষে প্রধান আলোচকের ভূমিকা পালন করছিলেন এই স্টিভ উইটকফ। ফলে তার ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক যোগাযোগের ওপর আড়ি পাততে পারলে আমেরিকার আসল উদ্দেশ্য জানা ইসরাইলের জন্য সহজ হতো। এনবিসি নিউজ এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস উভয় সংবাদমাধ্যমই তাদের এই বিস্ফোরক প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনের প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়েছে। এই সংবেদনশীল বিষয়ে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার পক্ষ থেকে আমেরিকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হলেও পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য বা জবাব দিতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইসরাইলি দূতাবাস এই পুরো প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে।নতুন এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত আমেরিকা ও ইসরাইলের মধ্যকার পারস্পরিক সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ভবিষ্যৎকে এক বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ইসরাইলকে টিকিয়ে রাখতে কোটি কোটি ডলারের সমরাস্ত্র ও অবারিত সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে আমেরিকা, যা গাজায় চলমান ভয়াবহ ও নির্মম মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যেও একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। এমনকি সমরাস্ত্রের আধুনিকায়ন, যৌথ গবেষণা এবং নতুন যুদ্ধপ্রযুক্তি তৈরির উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের একত্রে কাজ করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা বিল বর্তমানে আমেরিকার আইনসভা কংগ্রেসে পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই গুপ্তচরবৃত্তির খবরটি সামনে আসায় মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী আমেরিকা ও ইসরাইলের মধ্যে অত্যন্ত নিয়মিত ও উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান হয়ে থাকে, যা দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি। কিন্তু সেই দীর্ঘদিনের মিত্রতার সুযোগ নিয়ে ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনীর এই নতুন ও অভিনব অনুপ্রবেশের চেষ্টা খোদ মার্কিন কর্মকর্তাদেরই স্তম্ভিত করে দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও একটি ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, এর আগে ২০২১ সালে ডিআইএ-এর মূল সদর দপ্তরের ভেতরে অত্যন্ত গোপনে নিখুঁত আড়ি পাতার যন্ত্র স্থাপন করেছিল ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও ভিআইপিদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিক্রেট সার্ভিসের একটি বিশেষায়িত সরকারি যানবাহনের ভেতরেও একই ধরনের অত্যাধুনিক আড়ি পাতার সরঞ্জাম বসিয়েছিল ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিনবেত, যা দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাসের দেয়ালকেই স্পষ্ট করে তোলে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল