প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
সীমান্ত ইস্যুতে দিল্লিতে মুখোমুখি বিজিবি-বিএসএফ
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
সীমান্তে একের পর এক বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানি এবং সম্প্রতি ভারত থেকে পুশইন বা বাংলাদেশে জোরপূর্বক অবৈধ অনুপ্রবেশ করানোর ধারাবাহিক অপচেষ্টার কারণে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এই উত্তপ্ত ও সংবেদনশীল পরিস্থিতির মধ্যেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর প্রধানদের মধ্যে এটাই প্রথম মহাপরিচালক পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক সীমান্ত সম্মেলন। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যকার এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনটি চার দিনব্যাপী চলবে। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি কেবলই একটি রুটিনমাফিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নয়, বরং ঢাকার জন্য এটি নিজেদের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ও ন্যায্য দাবিগুলো জোরালোভাবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার এক বড় পরীক্ষা।বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে বিজিবি প্রধানের নেতৃত্বে পনেরো সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের দল ইতিমধ্যেই ভারতের রাজধানীতে পৌঁছেছে এবং আলোচনার জন্য নিজেদের এজেন্ডা চূড়ান্ত করেছে। এবারের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে জ্বলন্ত ও সংবেদনশীল দুটি ইস্যু—সীমান্তে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড এবং পুশইন বা পুশব্যাক—সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উত্থাপন করা হচ্ছে। এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নিচ্ছেন, যার মধ্যে রয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর এবং যৌথ নদী কমিশনের প্রতিনিধিরা। অন্যদিকে, বিএসএফ মহাপরিচালকের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় প্রতিনিধিদলেও দেশটির স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থার নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত থাকছেন। রুটিনমাফিক এই বৈঠকের আড়ালে এবার ঢাকার ঝুলিতে রয়েছে সুনির্দিষ্ট সাতটি অমীমাংসিত ও স্পর্শকাতর অভিযোগ, যা বাংলাদেশের জনমনে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়ে আসছে।বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের সবচেয়ে বড় ক্ষত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্ট উদাহরণ হলো ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিরস্ত্র ও নিরীহ বাংলাদেশিদের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমান্তকে আগ্নেয়াস্ত্রহীন রাখা এবং মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হচ্ছে। এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি নাগরিকদের মনে সার্বক্ষণিক একটি আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। কিছুদিন আগেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার পাথরিয়াদ্বার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একজন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এবং একজন বয়োবৃদ্ধ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হন এবং আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। বারবার উচ্চপর্যায়ের প্রতিশ্রুতির পরও সীমান্তে গুলির ঘটনা বন্ধ না হওয়ায় এই নির্মমতার স্থায়ী অবসান চেয়ে এবার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেবে বাংলাদেশ।হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য নতুন এক নিরাপত্তা সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার বিষয়টি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ভারতীয়কে বাংলাদেশে পুশইন করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা এবং বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ্যমূলভাবে অস্থিতিশীল করার জন্যই হঠাৎ করে এই অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা শুরু করে ভারত। তবে স্থানীয় সীমান্তবর্তী জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তায় বিজিবি ভারতের এই অপচেষ্টা বারবার প্রতিহত করে আসছে। সম্প্রতি বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া খুলে নারী ও শিশুসহ তেরোজনকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে বিজিবি তা দৃঢ়ভাবে ঠেকিয়ে দেয় এবং এরপর থেকে সমগ্র সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়। অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে কোনো অপরাধী বা রাষ্ট্রদ্রোহী উপাদান রয়েছে কিনা—তা নিশ্চিত না হওয়ায় এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের প্রসঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক পুশইন-সংক্রান্ত বিষয়গুলো বৈঠকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে। তবে সীমান্তে বাংলাদেশিদের মৃত্যু নিয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া একটি বিতর্কিত বক্তব্যের জের ধরে দিল্লির এই সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল কিছুটা মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাপের মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মন্ত্রী বলেছিলেন, সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় সংঘটিত সব মৃত্যুকেই ঢালাওভাবে সীমান্ত হত্যা বলা ঠিক নয়, কারণ অন্য দেশের অভ্যন্তরে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবস্থায় কেউ নিহত হলে সেই ঘটনাকে একই সংজ্ঞায় ফেলা উচিত নয়। মন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।এ ছাড়া সীমান্তের ওপার থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে মারণাস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বিপুল পরিমাণ মাদক প্রবেশের বিষয়টিও এবারের এজেন্ডায় রয়েছে। বিভিন্ন চোরাই রুট ব্যবহার করে ভারতীয় চোরাকারবারিরা বাংলাদেশের অপরাধী চক্রের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক বিরাট হুমকি। সুনামগঞ্জের সীমান্ত থেকে বিজিবি বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকসহ বড় বড় চালান জব্দ করেছে, যা প্রমাণ করে ওপার থেকে অপরাধের বিস্তার কতটা ভয়াবহ। একই সাথে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংস করতে ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে গড়ে ওঠা অবৈধ ফেনসিডিল ও মাদক তৈরির কারখানাগুলোর বিষয়েও বাংলাদেশ তীব্র আপত্তি জানাবে। যশোর, বেনাপোল, সিলেট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বেশ কিছু সীমান্ত রুট দিয়ে বাংলাদেশে দেদারসে ঢুকছে বিষাক্ত সিনথেটিক মাদক। এই উৎসমুখগুলো বন্ধ করার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সীমান্ত নিরাপদ করা অসম্ভব।একই সময়ে, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বিভিন্ন অপরাধী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকাও এবার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। আন্তর্জাতিক বিধিমালা লঙ্ঘন করে নো-ম্যানস ল্যান্ড বা শূন্যরেখা থেকে একশত পঞ্চাশ গজের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টার বিরুদ্ধেও ঢাকা শক্ত অবস্থান নেবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপ, বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকার কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের ক্যাম্প এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রধানের ভারতে অবস্থান করার অভিযোগ নিয়েও এবারের সম্মেলনে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হবে। দুই দেশের দীর্ঘ চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এই স্থল সীমান্ত শুধু দুটি ভূখণ্ডকে আলাদা করে না, বরং লাখ লাখ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। ১৯৭৫ সালের সীমান্ত নির্দেশিকার আওাতে বছরে দুবার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে আসলেও সমাধানের গতি বরাবরই অত্যন্ত হতাশাজনক। নয়াদিল্লির আলোচনার টেবিলে এবার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—সীমান্তের এই রক্তপাত এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের স্থায়ী সমাধান কবে আসবে, তার একটি কার্যকর ও দৃশ্যমান উত্তর খুঁজে বের করা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল