প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলি স্থাপনাকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু বলল ইরান
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছেছে, যেখানে যেকোনো মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসী ও ধারাবাহিক সামরিক অভিযান বন্ধ করার ব্যাপারে ইরানের পক্ষ থেকে বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই বার্তা উপেক্ষা করায় অবশেষে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে সরাসরি ঝাঁকে ঝাঁকে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে তেহরান। তবে এই সংঘাত কেবল একতরফা থাকেনি; ইরানের এই দুঃসাহসিক পদক্ষেপের পর পরই পাল্টা জবাব দিয়েছে তেল আবিব। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, তারা মধ্য ও পশ্চিম ইরানের সুনির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করে অত্যন্ত নিখুঁত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। পাল্টাপাল্টি এই হামলার ঘটনায় পুরো বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।এই সংঘাতের পটভূমি বিশ্লেষণ করে ইরানের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এক কড়া বার্তায় উল্লেখ করেন, ইরানের ওপর অন্যায়ভাবে মার্কিন নৌ অবরোধ আরোপ এবং লেবাননে হামলা আরও জোরদার করতে ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যে প্রচ্ছন্ন সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে, তার পরিণাম ভালো হবে না। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলি স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্ত স্থাপনা এখন ইরানের জন্য সম্পূর্ণ বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরগুলোতে, যা মূলত ইরানের মিত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর প্রধান শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। গালিবাফ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে লিখেছেন যে, প্রতিপক্ষ কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতির শর্ত বা প্রতিশ্রুতি মানছে না এবং তারা শান্তিপূর্ণ সংলাপেও বিশ্বাস করে না। লেবাননসংক্রান্ত চুক্তি বারবার লঙ্ঘন করা এবং নতুন করে নৌ অবরোধ আরোপের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, তারা আসলে কেবল শক্তির ভাষাই বোঝে। আর তাই তাদের সেই ভাষাতেই জবাব দেওয়া হচ্ছে।এদিকে, মাঠপর্যায়ের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রবিবার রাতে স্থানীয় সময় আনুমানিক দশটার দিকে ইরান থেকে ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডকে লক্ষ্য করে কয়েক দফায় এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। আকস্মিক এই আক্রমণের সাথে সাথেই পুরো ইসরায়েলজুড়ে তীব্র সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপদ বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি তাদের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই হামলার দায় স্বীকার করে নিশ্চিত করেছে যে, তারা মূলত দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে ইসরায়েলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটিকে সফলভাবে নিশানা করেছে। ইরানের সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের টায়ার ও নাবাতিহ অঞ্চলের নিরীহ ও নিপীড়িত জনগণের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো নির্বিচার হত্যাকাণ্ড এবং লাখ লাখ মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যে অমানবিক অপরাধ, তার প্রতিশোধ হিসেবেই এই জোরালো পাল্টা আঘাত হানা হয়েছে।ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে এই অভিযানকে একটি প্রাথমিক সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যদি ইসরায়েল তাদের এই অন্যায় আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটায়, তবে আগামী দিনে ইরানের পক্ষ থেকে এর চেয়েও অনেক বড়, ব্যাপক এবং বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে, যার আওতায় এই অঞ্চলের সমস্ত আমেরিকান ও ইসরায়েলি ঘাঁটি চলে আসবে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এই যৌথ সামরিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতাকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে লেবাননের সীমান্তজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত বোমাবর্ষণ, আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মুখে ইরানের এই সরাসরি সামরিক অবস্থান পুরো অঞ্চলের সমীকরণকে এক জটিল ও বিপজ্জনক মোহনায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরাশক্তিগুলোর এই শক্তির লড়াই যদি অবিলম্বে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে থামানো না যায়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তিশৃঙ্খলার জন্য এক বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল