প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
শিশু রামিসা হত্যা মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
রাজধানীর মিরপুর পল্লবী এলাকায় সাড়া জাগানো দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী শিশু রামিসা ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মামলায় দুই প্রধান আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে এক ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক রায় প্রদান করেছেন আদালত। আজ রোববার (৭ জুন) কঠোর নিরাপত্তা এবং আসামিদের সশরীরে উপস্থিতিতে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার মামলার রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের চুরান্ত ঘোষণার জন্য আজকের দিনটি সুনির্দিষ্টভাবে ধার্য করেছিলেন আদালত।নৃশংস এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের নিয়োজিত বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, অত্যন্ত নিখুঁত তদন্ত এবং আদালতে উপস্থাপিত অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত পৈশাচিক অপরাধের বিষয়টি শতভাগ প্রমাণ করতে পুরোপুরি সক্ষম হয়েছি। এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটি অবশেষে তাদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার পেল, যা সমাজে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ দমনে বড় বার্তা দেবে।আদালতের নথিপত্র এবং মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া শিশু রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির এক মেধাবী ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকালে সে নিজের ঘর থেকে স্বাভাবিকভাবে বাইরে বের হলে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিবেশী নারী আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে মিষ্টি কথায় ফুসলিয়ে এবং কৌশলে নিজেদের নির্জন কক্ষে নিয়ে যান। পরবর্তীতে সেখানে রামিসার ওপর পাশবিক ও অমানুষিক যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ চালানো হয় এবং ঘটনা ধামাচাপা দিতে শ্বাসরোধ করে তাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে অন্য এক আসামি সোহেল রানা নিজের অপরাধের আংশিক দায় স্বীকার করে জানায় যে, সে একা নয়, বরং ডলার নামের অন্য এক সহযোগীও এই অপরাধের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল, তাই তাকেও আইনের আওতায় আনা উচিত।এদিকে ঘটনার দিন দীর্ঘ সময় পরও মেয়ের কোনো খোঁজ না পেয়ে মা যখন চারদিকে হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করছিলেন, তখন একপর্যায়ে সন্দেহের বশে অভিযুক্তদের বন্ধ ঘরের দরজার সামনে শিশু রামিসার ব্যবহৃত জুতো জোড়া পড়ে থাকতে দেখেন। সন্দেহ তীব্র হওয়ায় ঘরের দরজায় বারবার ধাক্কা দিয়ে এবং ডাকাডাকি করেও কোনো ধরনের সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি চিৎকার শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর চিৎকারে আশপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ছুটে আসেন এবং সবার সহায়তায় ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা রামিসার অত্যন্ত নির্মম ও খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই পৈশাচিক দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে যান। তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হলে মিরপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরের ভেতর থেকে সহযোগী নারী আসামি স্বপ্নাকে হাতেনাতে আটক করে এবং পরবর্তীতে উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষ সহায়তা নিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।এই হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক ঘটনায় গত ২০ মে নিহত রামিসার পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে রাজধানীর পল্লবী থানায় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর গ্রেফতারকৃত প্রধান আসামি সোহেল রানা তদন্তকারী কর্মকর্তার সামনে এবং পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালতেও ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিজের দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী জবানবন্দি প্রদান করে।রামিসা হত্যাকাণ্ডের গুরুত্ব বিবেচনা করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় (২৪ মে) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান আদালতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেন। তদন্তের এই দ্রুত গতি দেখে আইনি মহল প্রশংসা করে। পরবর্তীতে গত ১ জুন ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেন। এই চাঞ্চল্যকর মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৮ জন তালিকাভুক্ত সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের গুরুত্বপূর্ণ ও চাক্ষুষ সাক্ষ্য গ্রহণ, জেরা এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে আজ দেশের প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ ধারা অনুযায়ী এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন বিজ্ঞ আদালত।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল