প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
শুল্ক যৌক্তিকীকরণে বড় পদক্ষেপ, কমছে ২৫০ পণ্যের কর
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শুল্ক বা ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণের এক বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রায় ২৫০টি ট্যারিফ লাইনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন আমদানিকৃত পণ্য, ভারী যন্ত্রপাতি ও উৎপাদনমুখী যন্ত্রাংশের ওপর বিদ্যমান কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই তালিকায় পরিবেশবান্ধব সোলার বা সৌরশক্তি প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, পোশাক খাতের ফেব্রিক বা কাপড়, প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য জীবিত মাছ ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণিসহ নানাবিধ জরুরি কাঁচামাল থাকতে পারে। তবে দেশীয় জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও বিলাসিতা নিরুৎসাহিতকরণের অংশ হিসেবে উদীয়মান ক্ষতিকর তামাকজাত পণ্যসহ প্রায় ৫০টি পণ্যের আন্তর্জাতিক কোডের ক্ষেত্রে শুল্কহার আরও বৃদ্ধি করার সম্ভাবনা রয়েছে।অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতিবিদ ও আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে আমদানিপণ্যের ওপর আরোপিত ন্যূনতম শুল্কমূল্য বা মিনিমাম ট্যারিফ ভ্যালু বাতিলের জোরালো দাবি জানানো হচ্ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কৃত্রিম শুল্কমূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বা ডব্লিউটিও-এর মূল নীতিমালার সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে এত আপত্তির পরও সরকারের রাজস্ব সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এবারও এই বিতর্কিত ব্যবস্থাটি বহাল রাখা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটসংশ্লিষ্ট অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই বিষয়ে গভীর আলোকপাত করে জানান যে, চলতি বছরের নভেম্বরেই বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি-এর তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণের একটি ঐতিহাসিক সময়সূচি নির্ধারিত রয়েছে। এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে এত দিন যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করে আসছিল, এই উত্তরণের পর অনেক উন্নত দেশ ও অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জন্য সেই বিশেষ সুবিধা আর কার্যকর থাকবে না। এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশকে অবশ্যই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি কিংবা এ ধরনের অন্যান্য আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটে প্রবেশ করতে হবে।বাণিজ্যিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জন্য যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায় করতে হয়, তবে সমপর্যায়ের পারস্পরিক সুবিধার খাতিরে ওই দেশ বা অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও সমপর্যায়ের বা কাছাকাছি শুল্ক ছাড়ের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান আমদানির শুল্কহার এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি উঁচু স্তরে রয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের প্রকাশিত বৈশ্বিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, পুরো বিশ্বের মধ্যে উচ্চ শুল্কহার বজায় রাখা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। সে সময় বাংলাদেশের গড় সামগ্রিক শুল্কহার ছিল প্রায় ২৮ শতাংশ। অথচ একই সময়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় এই গড় হার ছিল ২২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারতে ছিল মাত্র ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশ থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে গড় শুল্কহার ছিল ১০ শতাংশের অনেক নিচে। এছাড়াও মালয়েশিয়ায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় এই হার ছিল মাত্র ৮ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশগুলোর গড় শুল্কহার যেখানে মাত্র ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের শুল্কহার আন্তর্জাতিক সেই গড় হারের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। এই বিশাল শুল্ক প্রাচীর ভাঙার লক্ষ্যেই এখন ধাপে ধাপে শুল্কহার কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের পক্ষ থেকে এই ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণের দাবি অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছিল। এই লক্ষ্য পূরণে সে সময় একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করা হয়। সেই বিশেষ কমিটির চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই গত তিন বছর ধরে দেশের আমদানি শুল্কহার ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হচ্ছে।তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে যেসব খাতে শুল্ক ছাড় বা রেয়াত দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেগুলোর অধিকাংশ পণ্যেরই বার্ষিক আমদানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশ কম। ফলে এই শুল্ক হ্রাসের কারণে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আহরণের মূল লক্ষ্যমাত্রায় খুব বড় ধরনের কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শুল্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সম্মানিত সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান এই বিষয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, বিশ্ববাণিজ্যের এই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হলে উচ্চ শুল্কহার কমানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে বর্তমানে সরকার যে ধীরগতিতে এই শুল্ক কমাচ্ছে, তা আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। তিনি আরও যোগ করেন যে, শুল্ক কখনোই সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রধান হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়; এটিকে মূলত একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণ করার একটি নিয়ামক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো শুল্ককে মূলত রাজস্ব আহরণের বা সরকারি কোষাগার ভরার সহজ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, যা এই খাতের আধুনিকায়নের বড় বাধা।বর্তমানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আমদানিযোগ্য সামগ্রিক পণ্যের ট্যারিফ লাইনের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৬০০টিতে। সরকারি মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিগত তিন বছরে প্রায় পাঁচ শতাধিক ট্যারিফ লাইনে শুল্কহার ধাপে ধাপে সফলভাবে কমানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনায় ট্যারিফ লাইন হলো মূলত শুল্ক নির্ধারণ, বাণিজ্যের সঠিক পরিসংখ্যান সংরক্ষণ এবং সামগ্রিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে যেকোনো আমদানি বা রপ্তানি পণ্যকে সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার একটি বিশেষ কোডভিত্তিক বা সংখ্যাভিত্তিক পদ্ধতি। এটি আন্তর্জাতিকভাবে সর্বজনস্বীকৃত হারমোনাইজড সিস্টেম বা এইচএস কোডের ভিত্তির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় এবং এর চমৎকার কার্যকারিতার মাধ্যমে একই জাতীয় পণ্যের বিভিন্ন ভিন্ন রূপ, আকার, মান ও উপাদানকে আলাদা আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট করা যায়।সহজ একটি উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যেকোনো 'ইলেকট্রনিক পণ্য' বা বৈদ্যুতিক সামগ্রী হলো একটি অত্যন্ত বিস্তৃত বা বিশাল সামগ্রিক শ্রেণি। এর মধ্যে যদি আমরা 'মোবাইল ফোন' ধরি, তবে সেটি হবে একটি নির্দিষ্ট উপশ্রেণি এবং এর ভেতরে 'স্মার্টফোন' হলো আরও সুনির্দিষ্ট একটি পণ্য। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নিখুঁতভাবে কর আদায়ের সুবিধার্থে এই প্রতিটির জন্য পৃথক পৃথক কোড বা ট্যারিফ লাইন নির্ধারিত রয়েছে। এমনকি একটি আধুনিক মোবাইল ফোনের ভেতরে ব্যবহৃত বিভিন্ন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ, ব্যাটারি কিংবা মাদারবোর্ডের জন্যও আলাদা আলাদা আন্তর্জাতিক কোড বা ট্যারিফ লাইন নির্ধারিত থাকে, যার ওপর ভিত্তি করে দেশের কাস্টমস বিভাগ প্রতিটি পণ্যের ওপর সঠিক শুল্ক ধার্য করে থাকে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল