প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ক্ষতিপূরণে কাজে লাগাতে চায় ওয়াশিংটন
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনীতি ও সামরিক সংঘাত এক নতুন এবং অত্যন্ত জটিল মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি কুয়েত ও বাহরাইনে ইরান কর্তৃক আকস্মিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর, ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। এই নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক আগ্রাসনের কারণে সৃষ্ট নানাবিধ ক্ষয়ক্ষতি পূরণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের পুনর্নির্মাণ কাজের খরচ জোগাতে দেশটির অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করা বিপুল পরিমাণ সম্পদ পারস্য উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোতে স্থানান্তর করার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি বিশ্ববাসীর সামনে উঠে এসেছে, যা দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধি দলকে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এবং আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ কেবল বর্তমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভবিষ্যতে যদি ইরান এই অঞ্চলে আর কোনো ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তবে তা মেরামত ও পরিকাঠামো সংস্কারের কাজেও তেহরানের আটকে থাকা এই সার্বভৌম সম্পদ ব্যবহার করা হবে। মার্কিন সরকারের এমন কঠোর ও আপসহীন অবস্থান ঠিক এমন এক সময়ে সামনে এলো, যার মাত্র এক দিন আগে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজেদের শর্তের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলতে থাকা এই বিধ্বংসী যুদ্ধ বন্ধের যেকোনো ধরনের শান্তিচুক্তি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়া বা অবমুক্ত করার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে।মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ঠিক কোন কোন ক্যাটাগরির বা ধরনের সম্পদ উপসাগরীয় দেশগুলোতে স্থানান্তর করতে যাচ্ছে, তা কৌশলগত কারণে এখনো সুনির্দিষ্ট করে প্রকাশ করা হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি শুধু নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে থাকা অবরুদ্ধ হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর পরিধি আরও অনেক বিস্তৃত হতে পারে। ওয়াশিংটনের এই অনমনীয় পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও পর্দার আড়ালের কূটনীতির মাধ্যমে গড়ে ওঠা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অত্যন্ত ভঙ্গুর ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন এক চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং সম্পদের মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যকার মৌলিক দূরত্ব না ঘোচায় বর্তমানে উভয় দেশের মধ্যকার আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।অবশ্য এই চরম অচলাবস্থার মধ্যেই এক নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের একজন শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির জন্য একটি অত্যন্ত গোপনীয় ও বিশেষ চিঠি নিয়ে তেহরানে পৌঁছেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, এই কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে রণক্ষেত্রেও ব্যাপক সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। শনিবার ভোরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির গরুক এবং কেশম দ্বীপে অবস্থিত ইরানের উপকূলীয় রাডার সাইটগুলো লক্ষ্য করে প্রচণ্ড বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য তীব্র হুমকি তৈরি করা বেশ কিছু ইরানি ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করার পর, তার পাল্টা জবাব হিসেবে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে।এর জবাবে ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বা আইআরজিসি কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি বড় ধরনের হামলা চালানোর দাবি করেছে। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে ধেয়ে আসা ৭টি ইরানি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে, যার ফলে কোনো ধরনের প্রাণহানি না ঘটলেও মাটির ওপর বেশ কিছু বস্তুগত ও পরিকাঠামো গত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে বাহরাইনেও সম্ভাব্য বিমান হামলার সাইরেন বেজে উঠলে সাধারণ নাগরিকদের অনতিবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় দেশটির প্রশাসন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি শনিবার তেহরানে পৌঁছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে এক জরুরি ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। বৈঠক শেষে নকভি জানান, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে বিশেষ দূত হিসেবে আয়াতুল্লাহ খামেনির উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল চিঠি নিয়ে এসেছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের ভূরাজনৈতিক সমীকরণের পাশাপাশি ঢাকার বায়ুদূষণ ও ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনের মতো নানামুখী খবরের ভিড়ে এই আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন বিশ্ববাসীর প্রধান মনোযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘ দিন ধরে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে আসছিল, যেখানে মূল চুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মতো অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ের জন্য তুলে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তেহরান মূলত তাদের বিলিয়ন ডলারের আটকে থাকা তেলের রাজস্বের ওপর থেকে সব ধরনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চায়। উল্লেখ্য, বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার আগে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো, যা যুদ্ধের কারণে এখন কার্যত সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও অচল হয়ে পড়েছে। এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের দেশের অভ্যন্তরে তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। তবে ট্রাম্প মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সব চাপ উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন যে, মার্কিন বাহিনীর হামলায় ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গোপন কারখানা ইতিমধ্যেই মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন যে, তাদের কাছে এখনো কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থাকলেও, শতাংশের হিসাবে তা হয়তো মাত্র ২১ থেকে ২২ শতাংশের মতো অবশিষ্ট আছে, যা প্রথম আক্রমণের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই প্রত্যক্ষ সংঘাতের উত্তাপ এখন সমান্তরালভাবে প্রতিবেশী দেশ লেবাননেও মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ লেবাননে একটি চলন্ত সামরিক যানের ওপর ইসরাইলি বিমান হামলায় লেবানন সেনাবাহিনীর দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং একজন সাধারণ সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর ইরান বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, লেবাননের মাটিতে ইসরাইল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হলে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না। এরই মধ্যে হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসেম ইসরাইল ও লেবানন সরকারের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় তৈরি হওয়া একটি খসড়া শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন, কারণ সেই চুক্তিতে লেবাননের সীমানা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো সুনির্দিষ্ট শর্ত রাখা হয়নি। অপরদিকে তেল আবিবও সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিছু বিষয়ে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও তারা লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান কোনোভাবেই বন্ধ করবে না এবং সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে তাদের নেই।মূল উৎস: রয়টার্স ।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল