প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতায় যৌথ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করতে এক ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ ও তুরস্ক। দুই দেশের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যৌথ কমিটি গঠনে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। গতকাল শনিবার রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক সৌজন্য বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকেই উভয় দেশের মধ্যে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে।বৈঠকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে 'পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সভা' আয়োজনের বিষয়ে দুই পক্ষই একমত প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার কৌশলগত বন্ধনকে আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে উভয় দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সমন্বয়ে বার্ষিক 'টু প্লাস টু' তথা দুই যোগ দুই পরামর্শ সভা আয়োজনেরও এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজ নিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি স্থায়ী পরামর্শমূলক ব্যবস্থা বা কমিটি গড়ে তোলা হবে, যেখানে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, সামরিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।বৈঠকের শুরুতেই তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন বার্তা পৌঁছে দেন। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, তার বর্তমান এই ঢাকা সফরটি বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ককে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার প্রথম ও অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের জন্য তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে অদূর ভবিষ্যতে পারস্পরিক সুবিধাজনক যেকোনো সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশকে অবিরাম সমর্থন দেওয়ার জন্য, বিশেষ করে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে জোরালোভাবে সমর্থন করায় তুরস্ক সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বা পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।তিন দিনের অত্যন্ত ব্যস্ত ও সফল সরকারি সফর শেষে গতকাল ঢাকা ত্যাগ করার প্রাক্কালে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এক আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব মূলত এমন দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম জাতির বন্ধন, যারা যেকোনো সাধারণ বা বৈষয়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কঠিন ও প্রতিকূল সময়ে একে অপরের প্রতি অভূতপূর্ব সংহতি প্রদর্শন করেছে। তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, আগামী দিনগুলোতে উভয় দেশ এই আত্মিক বন্ধনকে আরও বেশি শক্তিশালী ও মজবুত করতে একসঙ্গে কাজ করে যাবে। মাঝখানে দেশের ব্যাংকিং খাতের সমসাময়িক কিছু খবরের ভিড়ে এই সফরটি কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান যে, তাদের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোতে ধারাবাহিক সফরের চতুর্থ ও সর্বশেষ গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। সফরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গেও তাদের অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও বিস্তারিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে এবং এ দেশের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষ যাতে শান্তি, সমৃদ্ধি ও টেকিশীল স্থিতিশীলতার মধ্যে বসবাস করতে পারেন, তার জন্য বর্তমান সরকারের নেওয়া ব্যাপক ও ইতিবাচক প্রচেষ্টা তারা অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন।হাকান ফিদান আরও যোগ করেন যে, দুই দেশের ভ্রাতৃত্বের গভীরতার সঙ্গে সংগতি রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আগামী দিনগুলোতে প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সহযোগিতা আরও উন্নত করতে তুরস্ক সম্পূর্ণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং একই ধরনের সংকল্প নিয়ে তারা বাংলাদেশি ভাই-বোনদের সব ধরনের সমর্থন অব্যাহত রাখবেন। উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি সম্প্রতি জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে আবারও বিশেষভাবে অভিনন্দন জানান এবং আশা প্রকাশ করেন যে তিনি এই বৈশ্বিক দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করবেন।সফরের অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে কক্সবাজারে অবস্থিত মায়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১০ লাখের বেশি অসহায় রোহিঙ্গা মুসলিমকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে এক অনন্য ও বিরাট মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক সমাধান খুঁজে বের করাই তুরস্ক ও বাংলাদেশের অভিন্ন লক্ষ্য। কক্সবাজার সফরে তারা তুর্কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন চলমান চিকিৎসা কার্যক্রম, টিকাদান কর্মসূচি, তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট, তুরস্ক দিয়ানেত ফাউন্ডেশন এবং অন্যান্য তুর্কি দাতা সংস্থার মানবিক কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। সেখানে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানবতার সেবায় নিয়োজিত তুর্কি ও বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিষ্ঠা ও ত্যাগের প্রশংসা করেন তিনি। উল্লেখ্য, তিন দিনের এই বিশেষ সরকারি সফরে হাকান ফিদান গত বৃহস্পতিবার রাতে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল থেকে সরাসরি ঢাকায় আসেন। শুক্রবার কক্সবাজার যাওয়ার আগে ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি তিনি দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ অন্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং সবশেষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ও এই ঐতিহাসিক সমঝোতার মাধ্যমে তার সফল সফর সমাপ্ত করেন।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল