প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
ইরানি ড্রোন ভূপাতিতের পর গরুক-কেশমে মার্কিন হামলা, পাল্টা হামলার দাবি আইআরজিসির
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
ইরান থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির দিকে ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ড্রোন মাঝ আকাশেই সফলভাবে ভূপাতিত করার পর শনিবার দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলের মূল রাডার স্থাপনাগুলোতে একযোগে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালিয়েছে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী। দুই পরাশক্তির মধ্যে নতুন করে তৈরি হওয়া এই তীব্র সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি আক্রমণের ফলে বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছিল, তা আরও অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরানের পাঠানো ওই চারটি ড্রোন মূলত পারস্য উপসাগরের এই অঞ্চলে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার উদ্দেশ্যে ওড়ানো হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনরত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তাদের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিশেষ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের এই উস্কানিমূলক ড্রোন তৎপরতার কড়া জবাব দিতেই যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের গরুক এবং কেশম দ্বীপের সামরিক নজরদারি ও রাডার কেন্দ্রগুলোতে নিখুঁতভাবে আঘাত হেনে সেগুলোকে অচল করে দিয়েছে।অন্য দিকে মার্কিন এই অতর্কিত হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ঘোষণা করেছে যে, তারা মার্কিন আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে এই অঞ্চলের শত্রু ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। তেহরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের প্রকাশিত এক সামরিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে অত্যন্ত সফলভাবে আঘাত করা হয়েছে। অথচ গত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চিরতরে বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি টেকসই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমানে পর্দার আড়ালে মূলত পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির প্রাথমিক খসড়া থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে আপাতত সরিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার মাধ্যমে সেগুলোর সমাধান করা যায়। যেকোনো ধরনের চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রধান শর্ত হিসেবে তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্ববাজারে তাদের তেল বিক্রির পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে জমে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ রাজস্বের ওপর থেকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করতে হবে, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থাকা সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং ইরানের প্রধান বন্দরগুলোর ওপর দেওয়া মার্কিন নৌ-অবরোধ অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের ঐতিহাসিক নিয়ন্ত্রণ বা একচ্ছত্র প্রভাব বজায় রাখার বিষয়টিও ইরানের অন্যতম প্রধান দাবিগুলোর একটি। উল্লেখ্য, এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো, যা বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।অন্য দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় নিজ দেশের জনগণের কাছে এই অজনপ্রিয় ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ বন্ধের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জোর দাবি করেছেন যে, মার্কিন বাহিনীর নিখুঁত হামলায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বেশিরভাগ কারখানা ইতিমধ্যেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে ট্রাম্প মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে পুরোপুরি অস্বীকার না করে এটিও স্বীকার করেছেন যে, তেহরানের মোট দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখনও সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রয়ে গেছে। এনবিসি নিউজের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তাদের কাছে এখনও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন অক্ষত রয়ে গেছে। তিনি শতাংশের হিসাব টেনে বলেন যে, হয়তো তাদের মোট ক্ষেপণাস্ত্রের ২১ থেকে ২২ শতাংশ এখনও সচল আছে, যা আপাতদৃষ্টিতে একটি বড় সংখ্যা মনে হলেও মার্কিন সামরিক বাহিনী যখন প্রথম আক্রমণ শুরু করেছিল, তখনকার বিশাল মজুতের তুলনায় এটি আসলে তেমন কিছুই নয়। সাক্ষাৎকারে ইরানের শীর্ষ নেতারা কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বেশ ইতিবাচক সুরেই বলেন, কারণ তারা ইতিহাসজুড়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গর্বিত জাতি। এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতি ও কাজ এখন তাদের বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে, যা তারা আগে কখনও কল্পনাও করেনি। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তাদের সামনে আর কোনো সহজ বিকল্প পথ খোলা নেই, তাই পুরো বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ নিতে হয়তো কিছুটা বাড়তি সময় লাগছে।এরই মধ্যে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রতি পুনরায় নিজেদের প্রকাশ্য সমর্থন ও সংহতি ব্যক্ত করেছে ইরান। সেই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের ভূখণ্ড থেকে অনতিবিলম্বে সব ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কড়া দাবি জানিয়েছে দেশটি। ইরানের এই নতুন অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান বৃহত্তর সংঘাত অবসানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির পথে নতুন এক পাহাড়সম জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যেকোনো ধরনের শান্তি চুক্তি সম্পাদন এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা একটি প্রধান ও অলঙ্ঘনীয় শর্ত। উল্লেখ্য, গত মার্চ মাসের শুরুর দিকে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে এই ভয়াবহ লড়াই শুরু হয়। লেবাননের প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেল আল মায়াদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান যুদ্ধ কেবল তখনই শেষ হবে, যখন লেবাননের মাটিতে চলা সংঘাতের অবসান ঘটবে। তিনি আরও যোগ করেন যে, লেবাননে যুদ্ধ অবসানের সাথে অবশ্যই অধিকৃত অঞ্চলগুলো থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতা নাঈম কাসেম ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের একটি মার্কিন প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার পরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে এই জোরালো বক্তব্য এলো। হিজবুল্লাহর দাবি, ওই মার্কিন শান্তি চুক্তিতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো স্পষ্ট শর্ত ছিল না এবং হিজবুল্লাহকে সেই আলোচনার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও রাখা হয়নি, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।সূত্র: রয়টার্স
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল