প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬
হামের পুরোনো বি৩ ধরনেই বাড়ছে সংক্রমণ
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রকোপে দেশের অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রবীণ ব্যক্তিরাও ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে রোগটির এই আকস্মিক বিস্তারের নেপথ্যে কোনো বিদেশি বা নতুন জীবাণু কাজ করছে না, বরং অতি পরিচিত পুরোনো একটি রূপই নতুন করে তাণ্ডব চালাচ্ছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি জনস্বাস্থ্য ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাগারে আক্রান্ত রোগীদের শরীর থেকে নেওয়া জীবাণুর জিনগত বৈচিত্র্য বা জিন বিশ্লেষণ করে এই বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছেন দেশের শীর্ষ বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই রোগটি দেশের বাইরে থেকে বা কোনো বিশেষ শরণার্থী শিবির থেকে নতুন করে ছড়ায়নি, বরং দেশের পরিবেশেই এটি আগে থেকে সুপ্ত অবস্থায় ছিল।সরকারের নিজস্ব জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা জাতীয় পোলিও, হাম ও রুবেলা গবেষণাগার এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাগারে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে হামের এই জীবাণুর গঠন পরীক্ষা করা হয়েছে। অত্যন্ত স্বস্তির বিষয় হলো, দুটি স্বতন্ত্র পরীক্ষাগারের চুলচেরা বিশ্লেষণের ফলাফল হুবহু একই এসেছে। বিজ্ঞানীদের এই যৌথ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, হামের বি৩ নামক সুনির্দিষ্ট একটি ধরনের কারণেই দেশের মানুষ বর্তমানে গণহারে আক্রান্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট ধরনটি আজ থেকে বহু বছর আগে থেকেই বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সক্রিয় রয়েছে এবং সময়ে সময়ে এর প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।তবে গবেষণার এই ফলাফলের সমান্তরালে দেশের চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে এই রোগে মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা। ইতিমধ্যে দেশজুড়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছশোর গণ্ডি ছাড়িয়ে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নিয়মিত বুলেটিন ও বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শেষ চব্বিশ ঘণ্টার হিসাবেই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জন রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। এই নতুন সংখ্যাসহ এখন পর্যন্ত কেবল হামের বাহ্যিক লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৫১১ জন এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া হামের রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০ জনে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ অবশ্য মনে করছেন, হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের মৃত্যুর আসল কারণও মূলত হাম। দেশে শতভাগ নিখুঁত রোগ শনাক্তকরণের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকার কারণেই এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যুকে সরাসরি নিশ্চিত হামের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চিকিৎসা ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, অতীতে হামের কারণে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির কোনো নজির বা উদাহরণ নেই। বর্তমান মহামারিতে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, সেই মোট মৃতের সংখ্যার প্রায় আশি শতাংশেরই বয়স পাঁচ বছরের নিচে। দুঃখজনক বিষয় হলো, মৃত্যুর এই ধারা চলতি বছরের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল এবং সমস্ত সরকারি প্রচেষ্টার পরও এখনো পর্যন্ত এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। দেশের স্বাস্থ্য খাতের স্বাধীন গবেষকদের একটি বড় অংশ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জনসমক্ষে অভিযোগ করে আসছেন যে, মাঠ পর্যায়ে হামের যথাযথ চিকিৎসা ও সামগ্রিক রোগ ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের বড় গাফিলতি ও দুর্বলতা ছিল, যার কারণেই এই মৃত্যুর সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।অবশ্য এই অভিযোগের বিপরীতে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এক ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পর নতুন করে আক্রান্তের হার অনেকটাই কমে এসেছে। আর সংক্রমণ যখন কমতে শুরু করেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আগামী দিনগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে দেশের শিশুদের মাঝে সাধারণত ঠান্ডা লাগা বা মারাত্মক নিউমোনিয়ার প্রকোপ দেখা যায় এবং তাতেও অনেক শিশু মারা যায়। ফলে বর্তমানে ঘটে যাওয়া সমস্ত মৃত্যুকে ঢালাওভাবে কেবল হামের কারণে হয়েছে বলে ধরে নেওয়াটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পুরোপুরি সঠিক হবে না।হামের এই রূপটি সম্পর্কে জানতে দেশের ভাইরোলজি বা ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত হামের মোট চব্বিশটি ভিন্ন ভিন্ন ধরন বা রূপ আবিষ্কার করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় এক দশক ধরে বি৩ রূপটিই নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছে। সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা জানান, তাঁরা ২০১৪ সালে দেশের মাটিতে প্রথমবার এই বি৩ রূপের সন্ধান পেয়েছিলেন। অবশ্য এর মাঝে ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে যখন হঠাৎ হামের বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন গবেষণায় ডি৮ নামক আরেকটি ভিন্ন রূপের উপস্থিতি মিলেছিল। তবে সেই সময়টুকুর ব্যতিক্রম ছাড়া দেশের বাকি সব অঞ্চলের নমুনাতেই সবসময় বি৩ রূপটিই পাওয়া গেছে। ফলে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, এই রোগটি আমাদের সমাজেই ছিল, তাই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে এটি নতুন করে ছড়িয়েছে বলে যে গুঞ্জন রয়েছে, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।এদিকে টিকার পর্যাপ্ততা ও এর গুণগত মান নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হলেও মাঠ পর্যায়ে মৃত্যুর লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। শুরু থেকেই দেশের বড় বড় হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা লক্ষ্য করা গেছে। যেমন মার্চ মাসের শুরুতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের ছোঁয়াচে জীবাণু নিয়ে আসা শিশুদের সাধারণ ও অন্য অসুস্থ শিশুদের সাথে একই ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, যা সংক্রমণকে আরও বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসকেরা সংক্রামক ব্যাধির ভয়াবহতা জেনেও কেন এই অসতর্কতা দেখিয়েছিলেন, তা নিয়ে সে সময় তীব্র সমালোচনা হয়েছিল।সাধারণত হামে আক্রান্ত হলে শিশুদের তীব্র ডায়রিয়া, কানের ইনফেকশন, চোখের নানাবিধ সমস্যা এবং শেষ পর্যায়ে ফুসফুসের মারাত্মক নিউমোনিয়া দেখা দেয়। আর এই নিউমোনিয়ার জটিলতার কারণেই মূলত অধিকাংশ শিশু মারা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে কিছু কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র বা ভেন্টিলেটর সরবরাহ করেছে এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে হামের জন্য পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি রাজধানী ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের কোভিড হাসপাতালটিকেও এখন পুরোপুরি হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু এত সব পদক্ষেপের পরও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে, দেশে হামের মতো একটি চেনা রোগের এমন মহামারি ঘটে গেল, অথচ দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ তা সঠিকভাবে মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনা করতে পারল না, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই জাতীয় জরুরি স্বাস্থ্য সংকটকে যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করার কথা ছিল, সেখানে এটিকে এক প্রকার অবহেলা করা হয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা শিশুদের এমন অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া কঠিন।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল