প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬
বাজেটে বড় লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবায়নে থেকে যায় ঘাটতি
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
দেশের রাষ্ট্রীয় বাজেট প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের চেনা ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা সবসময়ই এক ধরনের বড় ব্যবধানের মুখোমুখি হই। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিন দেশের এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বিগত দুই দশকের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে এমন একটি বছরও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে সরকার বাজেটে যা আশা করেছিল—অর্থাৎ যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার এবং যে পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, তা শতভাগ পূরণ করতে পেরেছে। এটিই আমাদের দেশের বাজেটের আসল রূপ। প্রতি বছরই একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা বা টার্গেট নির্ধারণ করা হয় বটে, তবে বছর শেষে দেখা যায় রাজস্ব আদায় কিংবা উন্নয়ন খাতে অর্থ ব্যয়—উভয় দিক থেকেই প্রায় দশ থেকে বিশ শতাংশের মতো বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।এই চিরন্তন বাস্তবতার পাশাপাশি আরেকটি দিকও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। যেহেতু ক্ষমতাসীন দলের একটি সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী ইশতেহার থাকে এবং সেখানে জনগণের কাছে কিছু বড় অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তাই নতুন বাজেটের রূপরেখা ও পরিকল্পনায় স্বাভাবিকভাবেই সেই রাজনৈতিক অঙ্গীকারের একটি প্রতিচ্ছবি বা প্রতিফলন রাখার চেষ্টা করা হয়। সম্প্রতি দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকের নিয়মিত অর্থনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠান ‘দ্য বিজনেস রিভিউ’-তে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংশ্লিষ্ট পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফারুক মেহেদী।অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, বাজেটের এই বিশাল পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা রূপ পাবে এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা সফলভাবে অর্জিত হবে, তা দেখার বিষয়। তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো যদি সত্যি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই মঙ্গলজনক। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আমাদের একটি পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। অর্থাৎ প্রতি বছরের বাজেটে অল্প অল্প করে পা ফেলে সরকার সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কি না, সেটাই মূল বিবেচ্য বিষয়। দেশের মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা বা চেষ্টার কোনো কমতি থাকে না। তবে বছরের শেষভাগে এসে যখন দেখা যায় অর্থায়নের তীব্র চাপ তৈরি হচ্ছে, তখন সেই প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে দেশের আসল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত কতটুকু কাজ করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। একটি সাধারণ পরিবার বা গৃহস্থালির বাজেট যেভাবে তার আয়ের বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়, সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিরও ঠিক তেমনি নিজস্ব কিছু নিয়ম ও বাস্তবতা থাকে। আর সরকারের এই বার্ষিক বাজেট মূলত হলো রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি প্রাক্কলন বা খসড়া মাত্র। সরকার দেশ পরিচালনায় আগামী এক বছরে ঠিক কত টাকা ব্যয় করবে এবং সেই বিপুল ব্যয়ের অর্থায়ন কোথা থেকে এবং কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, এটি তারই একটি আগাম অনুমান।এখন এই রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার সাথে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির যোগসূত্রটি অত্যন্ত নিবিড়। উদাহরণস্বরূপ, সরকার যদি তার এই বিশাল বাজেটের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য দেশের ব্যাংকিং খাত বা ব্যাংকগুলো থেকে অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে বা বিপুল পরিমাণে ঋণ গ্রহণ করতে শুরু করে, তবে তার একটি সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব বেসরকারি খাতের ওপর পড়তে বাধ্য। কারণ ব্যাংকগুলোর অধিকাংশ তহবিল যদি সরকার নিজেই ধার করে নিয়ে যায়, তবে দেশের বেসরকারি শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের জন্য যে পরিমাণ পুঁজি বা ফান্ডের প্রয়োজন, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি বা টান পড়বে, যা কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে।উক্ত বিশেষ অর্থনৈতিক আলোচনায় দেশের তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার শিল্পের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও অংশ নেন এবং ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নিজস্ব উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নতুন মেয়াদের সরকারের এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। তবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের আকার দেখে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ এবং সাধারণ মানুষ কিছুটা শঙ্কিত ও আতঙ্কিত বোধ করছেন। কারণ একটি সাধারণ নিয়ম হলো, বাজেটের আকার যখনই অনেক বড় করা হয়, তখন তা মেটানোর জন্য কর বা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাটাও অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আর যখনই এই রাজস্ব আদায়ের টার্গেট মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখন আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কর দিয়ে আসছি, অর্থাৎ যারা করের জালের আওতায় বা ট্যাক্স নেটের মধ্যে রয়েছি, তাদের ওপরই নতুন করে বাড়তি করের বোঝা বা প্রশাসনিক চাপ তৈরি করা হয়। রাজস্ব আদায়ের এই অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা প্রতিবারই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং বছর শেষে দেখা যায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।তিনি আরও তথ্য দিয়ে মনে করিয়ে দেন যে, গত বছর কর আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা পাঁচ লাখ কোটি টাকার ওপরে নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্জিত হয়নি। গত বছরও প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি এক বিশাল রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে কোনোমতে চার লাখ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে, তবে ব্যবসায়ী নেতার প্রশ্ন হলো—দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন কী আলাদিনের চেরাগ বা ম্যাজিক হয়ে গেল কিংবা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এমন কী বাম্পার ফলন বা জোয়ার চলে এলো যে, চলতি বছরেই হঠাৎ করে আরও তিন লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে? বর্তমান অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার বাজারে এটি কোনোভাবেই যৌক্তিক বা বাস্তবসম্মত মনে হয় না এবং কর আদায়ের এমন প্রাক্কলন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল