দীর্ঘদিন ধরে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ইরান অবশেষে যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন বা হৃদস্পন্দন হিসেবে পরিচিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হয়েছে বলে এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করেছে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর এবার তেহরানের পক্ষ থেকেও এই অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক সাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেল। এই সমঝোতা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক বিশাল স্বস্তি এনে দেবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধারা।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সরকারের তিনজন অত্যন্ত শীর্ষস্থানীয় ও নীতিনির্ধারক কর্মকর্তা এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তারা জানিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যে চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করতে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ইরান একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের খসড়ায় নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই কূটনৈতিক দরকষাকষির বিষয়ে এখনই প্রকাশ্যে বা আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার কোনো আইনি অনুমতি না থাকায়, নাম প্রকাশ না করার কঠোর শর্তে তারা এই পরম গোপন তথ্যটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির কাছে ফাঁস করেছেন।
যদিও ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের বিপরীতে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি, তবে চব্বিশ মে ভোরে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি পরোক্ষভাবে এই সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়ে উল্লেখ করেন যে, ইরান সর্বদা একটি মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতির পক্ষে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বাধীনতা ও নিজেদের অধিকার পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ রেখে একটি শক্তিশালী অবস্থান থেকেই বিশ্বমঞ্চে শান্তি প্রতিষ্ঠার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত মাসের শুরুর দিকে দুই পক্ষের মধ্যে যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই নতুন মন্তব্যকে দুই দেশের মধ্যকার চলমান চরম সংকট নিরসনে এবং একটি স্থায়ী ও টেকসই চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম শক্তিশালী ও ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ হওয়া সমঝোতার খসড়া শর্তাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান সরকার বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবহনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজকে কোনো প্রকার শুল্ক, অতিরিক্ত ফি বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলাচলের আইনি অনুমতি দেবে। এর ঐতিহাসিক বিনিময় হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের ওপর দীর্ঘদিন ধরে জারি রাখা তাদের কঠোর নৌ অবরোধ অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেবে। শুধু তাই নয়, এই সম্ভাব্য মহাপরিকল্পনার আওতায় লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি ফ্রন্টে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করার একটি কঠোর শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলগুলোতে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলি বাহিনীর তুমুল ও প্রাণঘাতী সংঘাত চলছিল, যা পুরো বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছিল।
অথচ গত এক সপ্তাহ ধরে যেখানে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা ইরানের ওপর নতুন করে বিধ্বংসী সামরিক হামলা চালানোর একের পর এক হুমকি দিচ্ছিলেন, সেখানে তেহরান অত্যন্ত চতুরতার সাথে এক দ্বিমুখী কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছিল। একদিকে তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সামরিক বাহিনীকে পুরোদমে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রেখেছিল, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে ওমানের মতো বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল। তেইশ মে’র পর পরিস্থিতি যেভাবে মোড় নিয়েছে, তাতে এটি একদম পরিষ্কার যে, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চেয়ে শেষ পর্যন্ত শান্তির কূটনৈতিক পথটিই জয়ী হতে চলেছে। তবে এই সম্ভাব্য চুক্তিটি কেবল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও অবরুদ্ধ জলপথ খুলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দশকের পর দশক ধরে চলা দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনীতিতে কোনো স্থায়ী শান্তি আসবে, তা নিয়ে এখনই আন্তর্জাতিক মহলে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে।

রোববার, ২৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
দীর্ঘদিন ধরে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ইরান অবশেষে যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন বা হৃদস্পন্দন হিসেবে পরিচিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হয়েছে বলে এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করেছে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর এবার তেহরানের পক্ষ থেকেও এই অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক সাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেল। এই সমঝোতা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক বিশাল স্বস্তি এনে দেবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধারা।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সরকারের তিনজন অত্যন্ত শীর্ষস্থানীয় ও নীতিনির্ধারক কর্মকর্তা এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তারা জানিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যে চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করতে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ইরান একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের খসড়ায় নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই কূটনৈতিক দরকষাকষির বিষয়ে এখনই প্রকাশ্যে বা আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার কোনো আইনি অনুমতি না থাকায়, নাম প্রকাশ না করার কঠোর শর্তে তারা এই পরম গোপন তথ্যটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির কাছে ফাঁস করেছেন।
যদিও ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের বিপরীতে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি, তবে চব্বিশ মে ভোরে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি পরোক্ষভাবে এই সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়ে উল্লেখ করেন যে, ইরান সর্বদা একটি মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতির পক্ষে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বাধীনতা ও নিজেদের অধিকার পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ রেখে একটি শক্তিশালী অবস্থান থেকেই বিশ্বমঞ্চে শান্তি প্রতিষ্ঠার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত মাসের শুরুর দিকে দুই পক্ষের মধ্যে যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই নতুন মন্তব্যকে দুই দেশের মধ্যকার চলমান চরম সংকট নিরসনে এবং একটি স্থায়ী ও টেকসই চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম শক্তিশালী ও ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ হওয়া সমঝোতার খসড়া শর্তাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান সরকার বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবহনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজকে কোনো প্রকার শুল্ক, অতিরিক্ত ফি বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলাচলের আইনি অনুমতি দেবে। এর ঐতিহাসিক বিনিময় হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের ওপর দীর্ঘদিন ধরে জারি রাখা তাদের কঠোর নৌ অবরোধ অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেবে। শুধু তাই নয়, এই সম্ভাব্য মহাপরিকল্পনার আওতায় লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি ফ্রন্টে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করার একটি কঠোর শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলগুলোতে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলি বাহিনীর তুমুল ও প্রাণঘাতী সংঘাত চলছিল, যা পুরো বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছিল।
অথচ গত এক সপ্তাহ ধরে যেখানে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা ইরানের ওপর নতুন করে বিধ্বংসী সামরিক হামলা চালানোর একের পর এক হুমকি দিচ্ছিলেন, সেখানে তেহরান অত্যন্ত চতুরতার সাথে এক দ্বিমুখী কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছিল। একদিকে তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সামরিক বাহিনীকে পুরোদমে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রেখেছিল, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে ওমানের মতো বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল। তেইশ মে’র পর পরিস্থিতি যেভাবে মোড় নিয়েছে, তাতে এটি একদম পরিষ্কার যে, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চেয়ে শেষ পর্যন্ত শান্তির কূটনৈতিক পথটিই জয়ী হতে চলেছে। তবে এই সম্ভাব্য চুক্তিটি কেবল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও অবরুদ্ধ জলপথ খুলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দশকের পর দশক ধরে চলা দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনীতিতে কোনো স্থায়ী শান্তি আসবে, তা নিয়ে এখনই আন্তর্জাতিক মহলে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে।

আপনার মতামত লিখুন